অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহারের দাবী ব্যবসায়ীদের

বিশেষ প্রতিবেদক:

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব দিয়ে সেখানে বিনিয়োগ করতে ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সরকারের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেউ যদি বিনিয়োগ করেন, তাহলে আয়ের ওপর ১০ বছর কর দিতে হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

জারি করা এসআরওতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেকোনো ধরনের শিল্প-কারখানা নির্মাণ কিংবা যেকোনো পণ্য উৎপাদন, সব কিছুতে ১০ বছর কর অবকাশ সুবিধার কথা বলা হয়। এছাড়াও জমির মূল্যের ওপর কোনো ধরনের ভ্যাট দিতে হবে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের নেওয়া হয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

ব্যবসায়ীরা যখন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি কিনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছেন, তখন এসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে সরকার।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীদের যখন কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে গেছে, তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদিত সব ধরনের পণ্যে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে না। সব ধরনের শিল্প-কারখানা আয়করমুক্ত থাকবে না। হাতে গোনা কয়েকটি শিল্প-কারখানা ও উৎপাদিত পণ্য কর অবকাশ সুবিধা পাবে। অন্যদের এখন থেকে আয়কর দিতে হবে।

এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা ৫০ বছরের জন্য যে জমি লিজ নিয়েছিলেন, সেখানে নতুন করে জমির মূল্যের ওপর বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। আবার সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীরা যে জমি লিজ নিয়েছিলেন, সেই লিজের কাগজপত্র দেখিয়েও ব্যাংকের ঋণ মিলছে না।

ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছ থেকে জমির বিপরীতে এনওসি চাইলে সেটাও মিলছে না। অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বন্দর, সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো মিলছে না এসব পরিষেবা। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের পর এখন সেসব সুবিধা প্রত্যাহার করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

তাঁরা বলছেন, সরকারের নতুন নীতির কারণে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ছে। লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নষ্ট হতে বসেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে সরকার বাড়তি চার হাজার কোটি ডলার ও এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়িত হবে না বলেও মনে করেন তাঁরা।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ টানতে হলে অবশ্যই নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবির প্রতি এফবিসিসিআইয়ের সমর্থন সব সময় রয়েছে।’

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজার) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে এমনিতেই ব্যবসা করা কঠিন। তার ওপর করোনার কারণে দেশে ব্যবসায় চলছে মন্দা। সেখানে জমির ওপর বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে ব্যবসায়ীদের জন্য আরো কঠিন হয়ে যাবে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুরোধ করেছি। আশা করছি, এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে।’

গত এক দশকে প্রতিবছর গড়ে ৬ শতাংশের ওপর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও বিনিয়োগ ছিল মোটামুটি স্থবির। জমির সংকট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায়ীদের কী কী প্রণোদনা দেওয়া হবে তা-ও বলা হয়। যেসব সুযোগ-সুবিধা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকারও ব্যবসায়ীদের দিয়ে আসছে। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প উদ্যোক্তাদের শিল্প-কারখানা নির্মাণের কাজ যখন দ্রুত এগিয়ে চলছে, তখনই গত ১০ মে এক গেজেট প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

তাতে বলা হয়, ২০১০ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইনের ৫ নম্বর ধারায় যেকোনো শিল্প-কারখানা ও যেকোনো পণ্যে ১০ বছরের যে কর অবকাশ সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি থাকবে না। এনবিআরের নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদিত চিনি, আটা, ময়দা, সিমেন্ট, লোহা ও লৌহজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয়ের ওপর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু থেকে ১০ বছরের জন্য দেওয়া আয়কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হলো।

এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে এসব পণ্য ও শিল্প-কারখানা আর কর অবকাশ সুবিধা পাবে না। আয়ের ওপর কর দিতে হবে। এসব শিল্প-কারখানা ও পণ্যের বাইরে যেসব শিল্প-কারখানা ও পণ্য উৎপাদন হবে, সে ক্ষেত্রে প্রথম তিন বছর শতভাগ কর অবকাশ সুবিধা, চতুর্থ বছর ৮০ শতাংশ, পঞ্চম বছর ৭০ শতাংশ, ষষ্ঠ বছর ৬০ শতাংশ, সপ্তম বছর ৫০ শতাংশ, অষ্টম বছর ৪০ শতাংশ, নবম বছর ৩০ শতাংশ এবং দশম বছর ২০ শতাংশ আয়কর অব্যাহতি পাবে।

ঘন ঘন এই নীতি বদলের সমালোচনা করে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব ধরনের শিল্প-কারখানা ও পণ্যে কর অবকাশ সুবিধা দিতে হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি লিজ নিয়েছেন ৫০ বছরের জন্য। জমির নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে সেখানে ভূমি উন্নয়ন করে এখন অবকাঠামো নির্মাণ করছেন।

এনবিআর এখন বলছে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির লিজ ভাড়ার ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। ২০১৮ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ভ্যাট আইনে জমিকে উপকরণ বা ‘ইনপুট’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জমিকে ইনপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে আগে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ভ্যাটের সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও নতুন বাজেটে সেই সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

একারণে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দিনশেষে যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবর পাঠানো চিঠিতে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ঋণের জন্য গেলে ব্যাংক থেকে বলা হয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ থেকে জমির এনওসি নিয়ে আসতে।

অন্যদিকে বেজাতে জমির এনওসির জন্য গেলে দেওয়া হয় না। এতে হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। সৃষ্ট এই জটিলতা নিরসনে বেজা যাতে এনওসি সরবরাহ করে তার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় সে দাবিও করেছেন ব্যবসায়ীরা।

সরকারি বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করা একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, বন্দরসহ যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেসব পরিষেবা তাঁরা এখনো পাননি। অনেক জায়গায় অ্যাপ্রোচ সড়ক হয়নি। সড়ক অবকাঠামো না হওয়ায় প্রকল্প এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়া যাচ্ছে না।

এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর তখনই কার্যকর হবে, যখন সেখানে বন্দর সুবিধা নিশ্চিত হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত মিরসরাইয়ে বন্দর সুবিধা দেওয়া হয়নি। আর চট্টগ্রাম বন্দর সব সময় থাকে ব্যস্ত। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মিরসরাইয়ে দ্রুত একটি বন্দর করার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।

দুরন্ত/১৮আগস্ট/আইপি