‘ঈদে আমি বাড়ি গেলেই সবাই বেশি খুশি হয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মোস্তাফিজুর রহমানের নিখুত কাটার, দারুণ স্লোয়ার আর বাঁহাতি পেসের কৌণিক ডেলিভারিগুলো বড় বড় ব্যাটসম্যানের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঁ-হাতি তাকে খেলতে নাভিঃশ্বাস উঠেছে বিশ্বমানের উইলোবাজদেরও।

তাইতো বছর না পেরুতেই মোস্তাফিজের নানা বিশেষণযুক্ত নাম চাউর হয়ে যায়। কেউ ডাকেন ‘কাটার মাস্টার।’ কারো চোখে তিনি ‘স্লোয়ার স্পেশালিস্ট।’

কিন্তু ইনজুরির কারণে হঠাৎ করেই বলের ধার কমে গিয়েছিল। যে কাটার খেলতে আর যে স্লোয়ার বুঝতে অতি বড় ব্যাটসম্যানেরও কষ্ট হতো, সেই দুই ধারালো আর প্রধান অস্ত্র মাঝে কেমন যেন নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছিল মোস্তাফিজের।

যে কারণে সাফল্যের হার গিয়েছিল কমে। ম্যাচ উইনার বোলার মোস্তাফিজ গড়পড়তা মানের বোলারে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন প্রায়।

আশার কথা, এবারের আইপিএলে আবার যেন সেই চেনা মোস্তাফিজের দেখা মিলছে। রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে আইপিএলে আবার যেন হারানো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন মোস্তাফিজ। কাটার, স্লোয়ার আর বাঁ-হাতি কৌনিক ডেলিভারির সাথে ডান হাতি ব্যাটসম্যানদের বিপাকে ফেলার কার্যকর অস্ত্র আউট সুইং (ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য ইনসুইং) ও রপ্ত করেছেন বেশ। আর তাই বোদ্ধা বিশেষজ্ঞদের মুখে আইপিএলে মোস্তাফিজের বোলিংয়ের প্রশংসা।

দেশে ফিরে কোয়ারেন্টাইনে আটকা মোস্তাফিজ। সস্ত্রীক আছেন হোটেল সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিকে।

কেমন আছেন, কোন খেলা নেই। দেশে থেকেও পরিবার ছাড়া ঈদ করতে হচ্ছে। অনুভুতিটা কেমন? হারানো ছন্দ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি আইপিএলে বোলিং ভাল হওয়ার কারণ কী? তবে কী টিম বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসনের চেয়ে রাজস্থান রয়্যালসের অস্ট্রেলিয়ান বোলিং কোচ তার বোলিংয়ের ধার বাড়াতে আর কাটার-স্লোয়ারে পারফেকশন বাড়াতে রেখেছেন বেশি কার্যকর ভূমিকা- এসব বিষয় নিয়ে একটি গণমাধ্যমের সাথে একান্তে কথা বলেছেন মোস্তাফিজ।

বলা হয়, বোমা মারলেও মোস্তাফিজের মুখ থেকে কোনো কথা বের করা অসম্ভব। যে কোনো প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ-না’তেই সীমাবদ্ধ রাখেন। আসুন শুনি মোস্তাফিজের সে সব কথাবার্তা-

প্রশ্ন : ভারতে আইপিএল খেলে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে আপনি সস্ত্রীক হোটেল সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিকে কোয়ারেন্টাইনে আছেন। কেমন লাগছে? কিভাবে সময় কাটছে, অনুভুতি কী?

মোস্তাফিজ : (একটু স্মিত হেসে) কি আর বলবো!

প্রশ্ন : আপনার স্ত্রীও সঙ্গে আছেন। এটা কি কোয়ারেন্টাইনে কিছুটা হলেও একাকীত্ব কমিয়েছে?

মোস্তাফিজ : জি অবশ্যই।

প্রশ্ন : আপনাদের কী হোটেল রুমেই কাটছে সময়? হোটেল লবি, রেস্টুরেন্ট, সুইমিং পুল কোথাও বের হওয়ার সুযোগ কী আছে?

মোস্তাফিজ : না, না। একদম ঘরে আটকা। কোথাও যাবার সুযোগ নেই। খাওয়া দাওয়াও ঘরের ভেতরে। হোটেল স্টাফরা এসে দরজার ওপারে দিয়ে যাচ্ছে, আমরা ভেতরে নিয়ে খেয়ে আবার হোটেল রুমের বাইরে রেখে দেই।

প্রশ্ন : অবস্থাদৃষ্টে পরিষ্কার, এবার আপনাকে আর সাকিবকে দেশে থেকেও পরিবারের সাথে ঈদ করা হচ্ছে না। কোয়ারেন্টাইনে থেকে পাঁচ তারকা হোটেলেই ঈদ করতে হবে। আগে কখনো কী পরিবার ছাড়া ঈদ করেছেন?

মোস্তাফিজ : ক্রিকেটার হওয়ার পর পরিবারের সাথে ঈদ মিস করার ঘটনা আছে বেশ কবার। সেই অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে শুরু, তারপর ২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পর থেকে কয়েকবারই পরিবার ছাড়া ঈদ করেছি।

বলার অক্ষো রাখে না, সেগুলো হয়ত দেশের বাইরে খেলতে গিয়ে না হয় দেশের মাটিতে জাতীয় দলের সাথে ঢাকা, চট্টগ্রামের কোথাও ঈদ করার অভিজ্ঞতা আছে। তবে দেশে থেকে আর ক্রিকেটীয় কর্মকান্ড ছাড়া এবারই প্রথম বাবা-মা ছাড়া ঈদ হবে। সে অভিজ্ঞতাটি হবে একদমই ভিন্ন।

প্রশ্ন : মনে আছে পরিবার ছাড়া প্রথম কবে ঈদ করেছিলেন?

মোস্তাফিজ : হ্যাঁ, ২০১২ সালে। অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে যুব বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলাম ইংল্যান্ডে। তখন প্রথমবার পরিবার ছাড়া ঈদ করতে হয়েছিল।

প্রশ্ন : পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ করার অভিজ্ঞতা আর অনুভুতি কেমন ছিল?

মোস্তাফিজ : আর বলেন না, বাবা-মা ছাড়া প্রথম ঈদ, সেটা ছিল রোজার ঈদ। আন্ডার নাইনটিনের হয়ে খেলতে গিয়েছিলাম ইংল্যান্ডে। অনুভুতিটা ছিল খুব কষ্টের। অনেক খারাপ লেগেছিল।

প্রশ্ন : ছেলে বেলার ঈদের দিনটি কিভাবে কাটতো? কী করতেন?

মোস্তাফিজ : ওরকম কিছু না। সব ছেলেপুলে ছোট বেলায় যা যা করে, আমিও তাই করতাম। মন চাইলে দল বেঁধে বন্ধুদের সাথে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি আর হইচই করে কাটতো ঈদের দিন।

প্রশ্ন : এখনকার ঈদের সাথে আগের ঈদের পার্থক্যটা কী?

মোস্তাফিজ : এখন আমি বাড়ি গেলেই সবাই খুব খুশি হয়। মজাটা হয় বেশি। ফ্যামিলির সবাই একত্রিত হই। সেটা অন্যরকম ভাল লাগার। বড় ভাই চাকুরি করেন। সে কারণে ভাই ও তার পরিবার তো আর বাড়িতে থাকে না। ভাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসেন। আমার বোনও আমার সাথে থাকে। কাজেই আমরা সবাই যখন ঈদে একত্রিত হই, তখন অনেক মজা হয়।

প্রশ্ন : এবারতো আর সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা হচ্ছে না। হোটেলে কোয়ারেন্টাইনেই কাটবে ঈদ। সবার কথা মনে করে খুব খারাপ লাগছে নিশ্চয়ই?

মোস্তাফিজ : হ্যাঁ, খুব খারাপ লাগছে।

প্রশ্ন : আচ্ছা! মিডিয়ায় একটা কথা চাওর আছে যে মোস্তাফিজ চুপচাপ। অন্তর্মুখী। পরিবারের সঙ্গেও কি মোস্তাফিজ একই রকম চুপচাপ থাকেন?

মোস্তাফিজ : উত্তর নেই (স্মিত হেসে)।

প্রশ্ন : পরিবারের সাথে কী একটু হলেও হইচই করেন না?

মোস্তাফিজ : ফ্যামিলির ভেতরে তো কিছুটা বেশি থাকারই কথা। সেটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন : ঈদের কোন স্মরণীয় সুখ-স্মৃতি আছে কী?

মোস্তাফিজ : না ভাই, কোন স্মরণীয় সুখ-স্মৃতি নেই। ওই যে ২০১২ সালে যুব বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ করেছিলাম ইংল্যান্ডে, সেটাই সবচেয়ে দুঃখের ঈদ স্মৃতি। খুব মন খারাপ হয়েছিল সেবার।

প্রশ্ন : আপনি এই কদিন আগেই ভারতের আইপিএল খেলে দেশে ফেরত এসেছেন। এবারের আইপিএলে আপনার পারফরমেন্স কেমন ছিল? মোস্তাফিজ নিজে তার আইপিএল পারফরমেন্সে কতটা সন্তুষ্ট?

মোস্তাফিজ : আমি খুশি। আনহ্যাপি না। সন্তুষ্ট। আমি যা চাচ্ছিলাম তার অনেকটাই হয়েছে। আমি বোলিংয়ের জন্য যা যা চাচ্ছিলাম, মানে যে কাজগুলো করতে চেয়েছি, তা শতভাগ না হলেও ৮৫ ভাগ পারফেক্ট হচ্ছিল। কাজেই অনুভুতিটা ভালই। আমি মোটামুটি হ্যাপি।

প্রশ্ন : আপনার টিমের মানে রাজস্থান রয়্যালসের পেস বোলিং কোচ কে?

মোস্তাফিজ : রব ক্যাসেল। অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোক।

প্রশ্ন : তিনিতো খুব অল্প সময় আপনাকে নিয়ে কাজ করলেন। মনে হলো আপনার সাথে তার বোঝাপড়াটা ভাল হয়েছে। তার কোচিংয়ে আপনি মনে হয় হারানো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন।একটু বলবেন আসলে রব ক্যাসেল আপনাকে নিয়ে কী কী কাজ করেছেন?

মোস্তাফিজ : আসলে খুব বড় কিছু নয়। আমি যেগুলো নিয়ে নিজ থেকে কাজ করছিলাম, সেগুলো পারফেকশন আনতে তিনি সাহায্য করেছেন।

প্রশ্ন : আইপিএলে আপনার কোন কোন বোলিং অস্ত্র শানিত হয়েছে বেশি?

মোস্তাফিজ : কাটারটা আল্লাহ দিলে মাশআল্লাহ ভাল যাচ্ছে। আমি ইনসুইংটা নিয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করছিলাম, যাতে সেটা আরও ভাল করতে পারি, সেখানে ওটা নিয়েও কাজ করেছি।

প্রশ্ন : এবারের আইপিএলে কোন উইকেট পেয়ে কিংবা কাউকে আউট করে কী বেশী ভাল লেগেছে?

মোস্তাফিজ : নাহ! আমার কাছে সব উইকেটই সমান। সব উইকেট শিকারের পরের অনুভুতিটাও সমান।

প্রশ্ন : শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট খেলা হয়নি। ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ দরজায় কড়া নাড়ছে। ওই সিরিজে মোস্তাফিজের লক্ষ্য কী?

মোস্তাফিজ : ভাই সিরিজ শুরুর এখনো বাকি দুই সপ্তাহ। আমি এখনই মাথায় কোন চাপ নিতে রাজি না। এখন কোয়ারেন্টাইনে আছি। এখান থেকে বের হয়ে মুক্ত বাতাসে যাই আগে, ফ্রী হই। স্বাভাবিক জীবনে ফিরি। ক’দিন অনুশীলন করি, তারপর প্ল্যান করবো। তার আগে এখন এই রুদ্ধঘরে কোয়ারেন্টাইনে থেকে সিরিজের টার্গেট নিয়ে ভাবতে চাই না।

প্রশ্ন : আপনার বোলিং দেখেই বোঝা যাচ্ছে রাজস্থান রয়্যালসের অস্ট্রেলিয়ান পেস বোলিং কোচ রব ক্যাসেলের কোচিং মেথডটা ক্লিক করেছে। আচ্ছা একটু বলবেন, বাংলাদেশ জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসন কী আপনার জন্য হেল্পফুল হচ্ছেন? তার কোচিং কী সত্যিই আপনার বোলিং উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে?

মোস্তাফিজ : জী, আমার জন্য হেল্পফুল হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি যেটা চাচ্ছেন, তাকে কী পাচ্ছেন ?

মোস্তাফিজ : হ্যাঁ, পাচ্ছি তো।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি বলতে চান টিম বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসনের সাথে কাজ করেও আপনি সন্তুষ্ট?

মোস্তাফিজ : হ্যাঁ, আমি সন্তুষ্ট। ওটিস গিবসনের ছোট ছোট কাজগুলো আমার জন্য বেশ ভাল হচ্ছে। বোলিং অ্যাকশন না পাল্টে বোলিং গ্রিপ এবং আরও কিছু সূক্ষ্ম বিষয় দেখিয়েছেন, যা আমার বেশ উপকারে দিয়েছে।

প্রশ্ন : ঈদে ভক্তদের জন্য মোস্তাফিজের কোন শুভেচ্ছা বাণী কিংবা বিশেষ কোনো বার্তা?

মোস্তাফিজ : সবাইকে ঈদ মোবারক। ঈদের শুভেচ্ছা। সেই সাথে একটা অনুরোধ, এই করোনাকালীন সময়ে আমরা যেন সবাই স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে চলি। সরকারের স্বাস্থ্য নীতি মেনে সবাই মাস্ক ব্যবহার করি। সোশ্যাল ডিস্টেন্স বজায় রেখে চলি। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমরা সবাই যেন সুস্থ থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ করতে পারি, সে কামনাই করি।

দুরন্ত/১৩মে/পিডি