করোনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্বাস্থ্য, চাই ইতিবাচক চিন্তা শক্তি

রায়হান ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

করোনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্বাস্থ্য, চাই ইতিবাচক চিন্তা শক্তি

করোনার দাপটে গোটা বিশ্ব আজ বিধ্বস্ত। হতাশা, বিষন্নতা, অবসাদ আর বিচ্ছিন্নতায় জন জীবন ক্লান্ত। উৎকন্ঠা আর দীর্ঘশ্বাসে কাঁটছে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি মুহূর্ত। দিগন্ত ছুটে চলা দুরন্ত জীবন যেন আজ হয়ে পড়েছে ছন্দহীন। উদ্বেগে কাঁটছে যেন দিন। মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখা গেছে অনেক শিক্ষার্থীকেই। এমন্তাবস্থায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে দুরন্ত নিউজের সাক্ষাৎকারে দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দিয়ে কথা বলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এনামুল হক।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান ইসলাম।

দুরন্ত নিউজঃ করোনা পরিস্থিতি কি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কোন প্রভাব ফেলেছে?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ
হ্যাঁ অবশ্যই, করোনা পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি।

দুরন্ত নিউজঃ
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কেমন প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ
অবশ্যই আমি বলব করোনা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।কেননা হঠাৎ-ই করোনা তাদের জীবনের ছন্দ পথকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। একটা চলন্ত রেলগাড়ীর বগি হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ধূ ধূ কোন প্রান্তরে আটকা পড়লে যেমন সেটার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীদের আজ করোনা পরিস্থিতিতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তারা অনেকেই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। উৎফুল্লহীনতা ও বিষন্নতায় তারা আজ জর্জরিত। একটা দিগন্ত ছুটে চলা দুরন্ত পাখিকে হঠাৎ খাঁচায় বন্দী করলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়! সেটাই হয়েছে আজ শিক্ষার্থীদের সাথে।

দুরন্ত নিউজঃ
শিক্ষার্থীদের এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কি?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ
আসলে গোটা বিশ্বেই আজ এক-ই অবস্থা। তাই পরিস্থিতি মেনে নিয়ে-ই জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।এক সময় বিশাল আকৃতির ডাইনোসর ছিল বলে আমরা বইয়ে কিংবা মুভি দেখে জেনেছি। কিন্তু প্রকৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে আজ তারা কালের গর্ভে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে জন্ম নেয়া তেলাপোকা আজ আকারে ছোট হলেও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কারণ তারা প্রকৃতির সাথে নিজেও বদলাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ডাইনোসর তা করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

তাই এমন্তাবস্থায় শিক্ষার্থীদের এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি উপায় হতে পারে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজের মধ্যে নিজেকে যুক্ত রাখা। এই আধুনিক যুগের একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে সর্বাবস্থায় টিকে থাকার মানসিকতা সম্পন্ন চিন্তা করা। শরীরের দিকে মনোযোগ দিয়ে নিয়মিত শরীর চর্চা ও খেলাধূলা করা। নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা, ঘুমানো, বাড়ির কাজে যুক্ত হওয়া এবং ধর্মীয় কাজ যেমন নামাজ আদায়/ উপাসনা ইত্যাদি কাজগুলো একটা রুটিন মাফিক করার চেষ্টা করতে হবে। কারন এই কাজগুলো ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যকে বিরক্তি, বিষন্নতা কিংবা একঘেঁয়েমিতা থেকে অনেকটা মুক্তি দেয়। মনে রাখতে হবে, “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাস”

তাই কাজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রেখেই নিজেকে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করতে হবে। আর সর্বদা পজিটিভ চিন্তা করতে হবে। নেগেটিভ চিন্তাই মূলত মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে।

দুরন্ত নিউজঃ
এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও কি শিক্ষার্থীদের প্রভাব ফেলবে?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ
এই সব নেতিবাচক প্রভাব শুধুমাত্র বর্তমানে নয় ভবিষ্যত জীবনেও এর প্রভাব জটিল আকার ধারণ করবে বলে আমি মনে করি। কারন দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষার্থীরা এভাবে ঘরবন্দী থাকতে থাকতে অনেকে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরতে পারে। একাকিত্বের মধ্যে থাকতে গিয়ে তাদের রাগ, খিটখিটে মেজাজ কিংবা আচরণের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাদের কর্মদক্ষতা হ্রাস পেতে পারে।

দুরন্ত নিউজঃ একাকিত্বতা কাটাতে শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল জগতে অগ্রসরতার বিষয়ে আপনার মতামত কি?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ হ্যাঁ, এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভার্চুয়াল জগতকে নিজের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে। যেখানে তারা বন্ধু বান্ধবের সাথে যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে।এটাকে এই মুহূর্তে খুব একটা খারাপ বলা যায় না। তবে ভার্চুয়াল জগত সাময়ীক কিছু কাজে আসলেও সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ নয়। পরবর্তীতে এটা অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যথাযথ ব্যবহার কাম্য এবং পারিবারিক ভাবেও এটার তদারকি নিশ্চিত খুবই প্রয়োজন।

দুরন্ত নিউজঃ করোনা পরিস্থিতি কি আত্মহত্যাকে প্রভাবিত করছে?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ হ্যাঁ,করোনা পরিস্থিতি অবশ্যই আত্মহত্যার প্রবণতা ত্বরান্বিত করেছে। কোন কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার উপর নির্ভর করেই আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়। যেমন পারিবারিক, সামাজিক কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত কোন পরিস্থিতির কারণে যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে। যেটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপবৃদ্ধি, দ্বন্দ্ব কিংবা ভীতি তৈরি করতে পারে।

দুরন্ত নিউজঃ সেক্ষেত্রে করণীয় কি?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ
সেক্ষেত্রে কাউন্সিলিং বা চিকিতসা মনোবিজ্ঞানীর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। সমস্যা যদি আরো প্রকট আকার ধারণ করে তবে সাইকিয়াট্রিস্ট এর চিকিৎসা নেয়া লাগতে পারে।

দুরন্ত নিউজঃ এমন্তাবস্থায় পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটুকু?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ অবশ্যই এখানে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু তাই নয় সমাজ, রাষ্ট্র সব ধরণের সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের নিয়ামক হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের মানসিক ভাবে সুস্থ রাখতে যৌথ পরিকল্পনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি কিংবা বিনোদন মূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের মানসিক উন্নতি তরান্বিত করা খুবই জরুরি। মনে রাখতে হবে বাঁচতে হলে সকলে মিলেই বাঁচতে হবে।

দুরন্ত নিউজঃ
সর্ব স্থানে যেন করোনার বাস!যাই দেখি, যাকে দেখি সবই যেন করোনা মনে হয়!! শারীরিক দূরত্বের চেয়ে মানসিক দূরত্ব যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সব সময় উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, হতাশা আর বিষন্নতা যেন চারপাশে বিরাজ করছে বলে মনে হয়। অল্পতেই বিরক্ত, রাগ অভিমান নিজেকে শেষ করার ইচ্ছে হয়!!

এই সার্বিক বিষয়ে আপনার পরামর্শ কি?

অধ্যাপক এনামুল হকঃ উদ্বেগ আসলে তখনই ক্ষতিকারক, যখন সেটা মাত্রাতিরিক্ত হয় এবং আতঙ্কের পর্যায়ে চলে যায়। যেকোনো চাপে মস্তিষ্ক আমাদের শরীর থেকে কিছু জৈব রাসায়নিক পদার্থ যেমন: এপিনেফ্রিন, নর-এপিনেফ্রিন এবং দীর্ঘ মেয়াদে কর্টিসল নিঃসরণ করে।এগুলো আমাদের শরীরের ভেতরের অর্গান সিস্টেমকে নানাভাবে প্রভাবিত করে এবং শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ তৈরি করে। ফলে চাপে আমাদের বুক ধড়ফড়, ঘাম দেওয়া, মুখ শুকিয়ে আসা, শ্বাস নিতে কষ্ট, মাথা ঘোরানো, মাথাব্যথা, পেটে সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। চাপ অতিরিক্ত হলে এসব উপসর্গ তীব্রভাবে অনুভূত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে অতিরিক্ত চাপ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও নষ্ট করে। শারীরিক উপসর্গের সঙ্গে সঙ্গে নানা মানসিক উপসর্গ, যেমন: খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা, নেতিবাচক চিন্তা, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। এ ছাড়া আতঙ্ক বা অতিরিক্ত উদ্বেগ থাকলে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয়।

তাই এসব থেকে মুক্তি পেতে সর্বদা নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখা। তবে কাজগুলো অবশ্যই আনন্দময় হতে হবে।তার জন চাই ইতিবাচক ইচ্ছা শক্তি। সঠিক তথ্য জানতে হবে। গুজবে কান দেয়া যাবে না। খেলাধূলা বা অনুশীলন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, মানসিক উৎফুল্লতা/ প্রশান্তি বাড়ায়, দুশ্চিন্তা, বিরক্তি,অবসাদগ্রস্থতা দূর করে।আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় হলে দুশ্চিন্তা কোন দিনও প্রবেশ করতে পারবে না। অন্য দিকে আত্মহত্যার প্রবণতাও মাথায় আসবে না।