কেন আন্দোলনে হামলা চালাতে হয়?

জোবাইদা নাসরীন:

১৭ অক্টোবর ফেনীতে ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী লংমার্চে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন। এ হামলায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। অথচ এর মধ্যে বাংলাদেশে একটি ভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করেছে সরকার। পুলিশ প্রশাসন থেকে সারাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করেছে। আর সেই দিনই হামলাকারীরা ছয়টি গাড়িও ভাঙচুর করেছে।

হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বইঠা-হাতুড়ি-হেলমেট-হকিস্টিক-রামদা-রিভলবার- শটগান নিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে কারা বিভিন্ন মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদ এমনকি মানববন্ধনেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা কারা, তা খুঁজতে এখন আর কসরত করতে হয় না। সবাই কমবেশি জেনে গেছেন এ দেশে কারা এসব হামলা করছে। শুধু হামলা করেই বসে থাকে না, অনেক সময় এরাই বাদী হয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় মামলা করে।

লক্ষণীয় বিষয়, এখন আন্দোলন দমাতে বা ঠেকাতে সরকারকে আর এককভাবে পুলিশের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন এই হামলা-মামলার দায়িত্ব নিয়েছে। এ ধরনের হামলার ধারাবাহিকতা আছে অর্থাৎ যে কোনো ধরনের আন্দোলন, প্রতিবাদী সমাবেশ এমনকি শান্তিপূর্ণভাবে সংঘটিত হওয়া মানববন্ধনেও হামলা নিয়মিত ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের যে কোনো আন্দোলনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ধরনের হামলা এবং পরপরই মামলা দেখতে পাই। আরও পরিষ্কার, যে দল ক্ষমতায় থাকছে তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোই এই দায়িত্ব নিচ্ছে। দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের থেকে এই বিষয়ে কোনো ধরনের নিষেধমূলক নির্দেশনা আসেনি। তাই ধরেই নেওয়া হয়, আন্দোলন ঠেকাতে বা দমন করতে এ ধরনের হামলা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে এক ধরনের স্বস্তিই দেয় এবং তাদের ছেলেদের এই ধরনের ক্ষমতার চর্চাকে তারা অনুমোদনই দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে যদি আমরা দেখি, ৯০-এর পর গত ৩০ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কোনো বড় ধরনের আন্দোলন তৈরি হয়, সাধারণ ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে কিংবা অন্য কোনো নামে—যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণই মুখ্য থাকে, সেখানেই অনিবার্যভাবে ছিল এই ধরনের হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক নিপীড়ন। কিন্তু হওয়ার কথা ভিন্ন। এই ধরনের আন্দোলনে ছাত্রসংগঠন হিসেবে তাদেরও সমর্থন দেওয়ার কথা।

এর বাইরেও যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে শিক্ষক আন্দোলন থেকে শুরু করে তেল-গ্যাস, বন্দর-বিদ্যুৎসহ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ বর্তমান সময়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন—সবটাতেই কখনো পুলিশের পাশাপাশি আবার কোনোটাতে এককভাবে হামলা করেছে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংঠন।

কেন এটা তারা করে কিংবা করতে হয়? ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে লংমার্চকে কেন বানচাল করতে হবে বা সেই কর্মসূচিতে হামলা চালাতে হবে? এটি কি স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের নির্দেশনা? এটি যদি তা না হয় তাহলে ওপরের নির্দেশনার বাইরে কেন এই অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বারবার একই ঘটনা ঘটিয়ে ক্ষমতাসীন দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে?

কেন এমন হচ্ছে? এই ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধরনের হামলা-মামলা করে আন্দোলন ঠেকানোর কৌশল আসলে একটি নির্দিষ্ট দল বাদে অন্যদের রাজনীতি বন্ধ করা এবং মানুষকে প্রতিবাদবিমুখ করার চেষ্টা। একচেটিয়া ‘ঝামেলা’বিহীন শাসনকে নিশ্চিত করতেই সদা তৎপর এই বাহিনীরা। এ ধরনের আন্দোলন ঠেকাতে যারা যত বেশি ভূমিকা রাখে, তাদেরই নানা পদ দিয়ে দলীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়। এভাবে তাদের বেপরোয়া আচরণ উৎসাহিত করা হয়। এই বিশেষ প্রক্রিয়া জারি আছে বলেই এদের অনেকেই ধর্ষণসহ অনেক অপরাধের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখে। কারণ তারা জানে দলের তরফে তাদের দরকার আছে। তাদের বিচার করা এত সহজ নয়।

এর বাইরে আরেকটি কারণ হলো, এই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটিয়ে জনমনে ত্রাস তৈরি করা হয়। কারণ সরকার জানে, দেশে চলমান ধর্ষণের ঘটনা মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। আর এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। তাই এগুলো নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকিতে যেতে চায় না ক্ষমতাসীন দল। তাই প্রথম অবস্থাতেই ‘ডান্ডা মেরে ঠান্ডা’ করে দেওয়ার কৌশলে আগাতে হচ্ছে দলটিকে। আর সে ক্ষেত্রে মাঠ কিংবা জাতীয় পর্যায়ে এই ডান্ডা মারার দায়িত্বে আছে ক্ষমতাসীন দলের ও অঙ্গসংঠনের নেতা-কর্মীরা।

সরকারকে ভাবতে হবে, যাদের কাজে লাগিয়ে আন্দোলন ঠেকানো হচ্ছে, তারাই কিন্তু সমাজের ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। কারণ তারা জেনে গেছে, তাদের ওপর সরকারের এক ধরনের নির্ভরতা আছে এবং তারাই সরকারকে ‘নিরাপদ’ রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আর এই হামলা করে আন্দোলন বন্ধ করার সংস্কৃতি দেশকে গণতন্ত্র থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারকে বুঝতে হবে, এ ধরনের মাস্তানতন্ত্রের ওপর ভর করে নিরাপদ বোধ করার ভাবনাটি অনেক বেশি বিপৎজনক হয়ে উঠছে খোদ সরকারের জন্য।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়