‘গুটিয়ে আসছে চাকরির বাজার’

অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম:

করোনাকালীন সময়ে বেকারত্ব ও বেকারদের নিয়ে পূর্বে আমি কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। আজকের বাংলাদেশ প্রতিদিনের ভাষ্যমতে,সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চাকরির বাজার গুটিয়ে আসছে।

বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, ব্যাংক- বীমা,স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে নতুন চাকরির সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে চাকরিচ্যুতি করেছে কর্মকর্তা – কর্মচারীদের।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে যে পরিমাণ ছাত্র- ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উচ্চশিক্ষিত হয়ে বের হচ্ছে, সে পরিমাণ কর্মক্ষেত্র নাই। ফলে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশী। অন্যদিকে এসএসসি পাশ বা এর নীচে থাকা জনগোষ্ঠী শ্রমিক হিসেবে বা কারিগরি বিভিন্ন খাতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।

এরকম আলোচনাই আমি ইতিপূর্বে করেছিলাম, সেখানে বলেছিলাম করোনার পূর্বেই আমাদের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষাধিক ছিল। করোনার কারণে তা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। উপরন্তু বিদেশে থাকা অসংখ্য কর্মী ছাটাই হয়ে দেশে ফেরত আসিতেছে। এতে প্রচন্ড চাপ তৈরী হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে কাজের বাজারে।

আগস্ট ‘২০ এ প্রকাশিত ‘ ট্যাকলিং দ্য কোভিড-১৯ ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট ক্রাইসিস ইন এশিয়া আ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক ‘ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার স্বল্পমেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান হারাতে পারে ১১ লাখ ১৭ হাজার যুব শ্রমশক্তি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ শুধু বাংলাদেশে নয়,দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে নেপাল, পাকিস্তানেরও বেকার দ্বিগুণ হওয়ার আশংকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের তরুণ বেকারত্বের হার ২৩.৩ ও শ্রীলঙ্কার বেকারত্বের হার ৩৭.৫ শতাংশে চলে যেতে পারে বলে আশংকা করা হয়েছে।

পত্রিকার ভাষায়, করোনার কারণে ‘ লকডাউন প্রজন্ম ‘ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে।

বেকারত্ব দেশের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। তাই এর সমাধানের চিন্তা সরকার ও বেসরকারি চাকরিদাতা অবশ্যই আমলে নিতে হবে।

বেকরত্বের কারণে সমাজে অস্হিরতা সৃষ্টি হয়।বেকারেরা কাজ না পেয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত হয়ে পড়ে।দেশের জিডিপির হারও কমে যায়।

সরকারি চাকরি সীমিত। বেসরকারি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯০ শতাংশ বেকারের কর্মসংস্থান করে থাকে। এরপরও অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী চাকরি না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় অথবা আকাঙ্ক্ষার নিচে যেকোন কর্মে নিযুক্ত হয়।কেউবা কোনো কর্ম না পেয়ে হতাশায় জীবন অতিবাহিত করে।

তাই সরকারেরও উচ্চশিক্ষিত,স্বল্পশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিতদেরকে শ্রেণীবিভাগ করে তাদের জন্যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বেকারত্ব দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনা তাই সরকারকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আবার সরকারের একার পক্ষেও বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব নয়,বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এগিয়ে আসতে হবে দেশ ও মানব সেবার ব্রত হিসেবে। এখানে এনজিওদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।

সরকার অবশ্য বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে বেকারত্ব দূরীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। কমসুদে ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে বেকারত্ব হ্রাসের প্রয়াস চালাচ্ছেন।

এখানে বলা আবশ্যক যে,আমাদের শিক্ষা ব্যবস্হাও ঢেলে সাজাতে হবে।বেকার বা কেরানী হওয়ার শিক্ষা থেকে সরে আসতে হবে।যার কারণে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় ও উপমন্ত্রী মহোদয় কারিগরি শিক্ষার দিকে শিক্ষার্থীদেরকে বেশি পরিমাণে ভর্তি হওয়ার আহবান জানান।যাতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বের হয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন এসময়ে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী ছাটাই করছেন বা ছাটাইয়ের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তারা যদি তাদেরকে ছাটাই না করে মানবতার দিক বিবেচনা করে, নিজের পরিবারের সদস্য মনে করে তাদের সম্বন্ধে কিছু দায়ভার নেন, তাহলে তারা ছাটাইয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়।

এক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যদি প্রণোদনা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরকে ছাটাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন তাহলে দেশে নতুন বেকার আর যোগ হবে না।
অপরদিকে বিদেশ থেকে আগত প্রবাসীদেরকেও যাতে তারা দেশে কিছু একটা করতে পারে তার ব্যবস্হা করা দরকার।

করোনার এ সময়ে সকল বেকার এবং যারা নতুন যোগ হচ্ছে তাদের নিজেদের ব্যাপারে নিজেরা উদ্যোগী হতে হবে।চাকরি পাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি নিজে উদ্যোক্তা হয়ে কিছু করার চিন্তা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবসময় যুবকদেরকে উদ্যোক্তা হওয়ার আহবান জানান।এতে নিজের কর্মসংস্থান হয়েও আরও অনেককে কর্মে নিয়োজিত করতে পারেন।

একা না পারলে সঠিক চিন্তা ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে গ্রুপ আকারেও উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা নেয়া যায়।

” আসুন উদ্যোক্তা হয়ে নিজে স্বাবলম্বী হই, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করি।”