চাঁদের আলো, গল্প (পর্ব-১)

সুমাইয়া আফরিন জুই:

“নারী ঘরের লক্ষী। সে সবসময় সকলের কথা মেনে চলবে। “এটাই আমাদের ধারণা। আমরা নারীকে তার নিজস্ব সত্তার দেখতে পছন্দ করি না। তাই কিছু কুপ্রথা দিয়ে তাদের বন্দী রাখতে চাই। কিন্তু বহুকাল আগে থেকেই অনেক নারী এসব কুপ্রথা ভেঙে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের মতোই মেয়ের জীবনকাহিনী চাঁদনী।

চল্লিশের এর দশকের কথা। একটি ছোট্ট গ্রামে এক কৃষকের ঘরে জন্ম হয় এক মেয়ের। জোছনা রাতে চাঁদের মতো রুপ নিয়েই সে পৃথিবীতে আসে।এত সুন্দরী একটি মেয়ে কে দেখেও কারো মুখে কোনো হাসি নেই, কারন সে যে মেয়ে।তখনকার তথাকথিত সমাজে কৃষকের ঘরে প্রথম সন্তান কন্যা মানেই ছিল সে ঘরের বোঝা। কিন্তু এই কৃষক ছিল সকলের থেকে আলাদা। সে ছিল আধুনিকমনাঃ ও ব্যতিক্রমী। সে বলেছিল মেয়ে আমার গর্ব এই মেয়ে একদিন দেশের দশের একজন হবে। চাঁদের মতো দেখতে ছিল বলে সে তার মেয়ের নাম দিলেন চাঁদনী। বাবার আদরের হলেও সকলের কাছে চাঁদনী ছিল অবহেলার। চাঁদনীর জন্মের পরে তার আরো তিনটি বোন হল।সকলেই ওর বাবাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে বলল। কারণ ছেলে না থাকলে ঘরের হাল ধরবে কে? কিন্তু চাঁদনীর বাবা কখনোই সেসব কথা ভাবেন নি। সে নিজের কিছু জমিতে চাষাবাদ করেই সংসার চালাতেন। এদিকে চাঁদনীর মাও তাকে নিজের ত্রুটি মনে করতে লাগলেন।

তখনই তার বাবা তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করলেন। তখনকার সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া বিলাসিতা বা বোকামি ছাড়া কিছুই ছিল না। বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার সূচনা করতে পারলেও তখনও তা সকলের কাছে আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হতে পারে নি। চাঁদনীর স্কুলে যাওয়া নিয়ে তার বাবা মায়ের থেকে প্রতিবেশিরা বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ল। সকলে মিলে যেন চাঁদনীর লেখাপড়া বন্ধে ব্রতী হয়ে গেল। “মেয়েরা লেখাপড়া করলে সংসার রসাতলে যায় “,”লেখাপড়া জানা মেয়েকে কেউ বিয়া করবে না “,চাষার মেয়ের আবার লেখাপড়া! ” আরও কত কী শুনতে হয়েছে তার বাবাকে। কিন্তু তবুও সে থামেনি। চাঁদনীও সকলের সকল বাধা তুচ্ছ করে লেখাপড়া শুরু করে। মেধাবী ছিল সে, তাই খুব কম সময়েই লেখা, অঙ্ক কষা সব শিখে ফেলে সে। চাঁদনীর চোখ দুটোতে ধীরে ধীরে আজানাকে জানার পিপাসা বাড়তে থাকে।

এভাবে পার হয় কিছু বছর। এখন সে বারো বছরের বিবাহযোগ্যা কন্যা।রুপে, গুনে সে সবার থেকে ভিন্ন। তার উপর চার বোনের মধ্যে বড়। তাই শুরু হয়ে গেল তার পরিবারের উপর সমাজের বিয়ে দেওয়ার চাপ। তার বাবা বুঝতে পেরেছিল যে সে মেয়েকে আর ঘরে রাখতে পারবে না, বিয়ে দিতেই হবে। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন উদয় হয় আবুল নামের এক ছেলের।সে তার এক আত্মীয়কে নিয়ে এসে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ছেলেটি নাকি কলকারখানায় কাজ করে, পাল্টি ঘর আর মেয়েদের লেখাপড়া জানাকে সে সম্মান করে। চাঁদনীর বাবা সব শুনে খুশি হয়ে রাজী হন। কিছুদিনের মধ্যেই চাঁদনী শশুড়বাড়ি চলে যায়।

কিন্তু শশুড়বাড়ি গিয়ে সে জানতে পারে তার এক সতীন আছে। তার সতীনের কোন ছেলে হয়নি বলেই তাকে বিয়ে করেছে তার স্বামী। গরীব বাবার কাছ থেকে তেমন গয়না আনতে পারে নি বলে তার শাশুড়ি তাকে প্রায়ই কথা শোনাত।