চাঁদের আলো, গল্প (পর্ব-২)

সুমাইয়া আফরিন জুই

এমনকি শাশুড়ির পছন্দ করত না বলে চাঁদনীর লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায়। চাঁদনীও বাকিদের মতো বন্দী হয়ে যায় সংসারের গন্ডিতে। দুবছর পর সে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।একই সময়ে চাঁদনীর সতীন জন্ম দেয় একটি পুত্র সন্তানের ।

বংশের প্রদীপ দিতে পারায় তার সতীন হয়ে গেল সকলের প্রশংসার আর সে হয়ে গেল গঞ্জনার পাত্রী। এভাবে চলে যায় আরো তিনটি বছর। এখন তার সতীন দুই ছেলে এক মেয়ের মা। তার চাঁদনী দ্বিতীয়বারের মতো একটি মেয়ের জন্ম দিয়েছে। এতে সে তার শাশুড়ির চক্ষুশূল তো হলোই তার উপর তার স্বামীও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

কিছুদিন পরেই চাঁদনীর শাশুড়ির কথায় চাঁদনীকে তার দুই মেয়ে সহ বাপের বাড়িতে রেখে আসে তার স্বামী। কারণ তারা দুই মেয়েকে খাইয়ে তাদের খাবারের অপচয় করতে চায়নি। চাঁদনীর সব বোনেদের বিয়ে দিয়ে তার বাবা আজ প্রায় নিস্ব। এর মধ্যেই চাঁদনী তার শশুড়বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে সারাজীবনের মতো চলে আসে।

প্রায় একবছর তার আর কোনো খোঁজ খবর নেয়নি তার স্বামী। সে বুঝতে পেরেছিল যে তার শশুড়বাড়ির পাঠ চুকেছে। সে স্বামী পরিত্যক্তা জানতে পেরে অনেকেই তাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সরাসরি সাহসের সাথে। তাদের একঘরে করবে এমন হুমকি পেয়েও সে হাল ছাড়ে নি। কিন্তু সে তার বাবার বোঝা হতে চায়নি। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল সে আবার লেখাপড়া শুরু করবে এবং একে পুজি করেই সে কিছু করবে। কিন্তু এতই কী সহজ! যাই হোক সে আবার নতুন করে শুরু করবেই। চাঁদনী আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করল। এরই মধ্যে তাদের গ্রামে এল এক দম্পতি। তারা স্কুলে মেয়েদের ইংরেজি শেখান। তাদের সাহায্যে চাঁদনী ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করতে লাগলো। এভাবেই পার হলো বেশ কিছু বছর।

এখন চাঁদনী একটি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাঁদনী আজ তার গ্রামেই নারীশিক্ষার অগ্রদূত। তার মেয়েরাও এখন লেখাপড়া করছে। শুধু তার মেয়েরা না চাঁদনী আজ অনেক মেয়ের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। আজ তার বাবা মা বেঁচে নেই ঠিকই কিন্তু সে তার বাবার স্বপ্ন সত্যি করতে পেরেছে। অনেকেই আজ চাঁদনীর পাশে এসে দাড়ালেও সমাজের কিছু নীচু মানসিকতার মানুষের কাছে আজও সে নিন্দিত। তবে তাতে সে মাথা ঘামায় না। চাঁদ যেমন আঁধার রাতকে আলোকিত করে , চাঁদের মতো আজ সেও কুসংস্কারের অন্ধকারকে শিক্ষার আলো দিয়ে মুছে দিচ্ছে।

বর্তমানে আমরা আধুনিক হয়েছি। বহু সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হয়েছি। কিন্তু তবুও কী সব মেয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে? আমরা কী তাদের সেই সুযোগ টা দিচ্ছি? তাহলে আজও কেন বহু মেয়েকে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে নিজেদের স্বপ্নের বলি দিতে হয়? কিন্তু এখন তো একবিংশ শতাব্দী ।তাহলে? আসলে আমরা কী সত্যিই নিজেদের চিন্তা ধারা পাল্টাতে পেরেছি?