চিনির থেকে কৃত্রিম মিষ্টি কি স্বাস্থ্যকর!

দুরন্ত ডেস্ক:

এক কাপ চা কিংবা কফি দিয়ে দিন শুরু করতে বেশিরভাগ মানুষই পছন্দ করেন। এজন্যে চায়ের স্বাদ বৃদ্ধিতে চিনি মিশিয়ে মিষ্টি করে তোলা হয়। তবে স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা চিনির বিকল্প কিংবা কৃত্রিম মিষ্টি বেছে নেন। কিন্তু চিনির বিকল্প মিষ্টি কি আমাদের জন্যে স্বাস্থ্যকর? আপনার কি সেগুলো গ্রহণ করা উচিত?

চিনি কী?

চিনি এক প্রকারের শর্করা, যা শরীরে বিশ্লেষিত হয়ে গ্লুকোজ উৎপন্ন করে এবং দেহে শক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। হজম প্রক্রিয়া চলাকালীন দেহ শর্করাকে ভেঙে ফেলে। তখন দ্রুত চিনির মাত্রা বাড়তে থাকে। প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত চিনি রক্তে শর্করার মাত্রাকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করে। এজন্যই বিশেষজ্ঞরা সর্বদা চিনি গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

চিনির বিকল্প বা কৃত্রিম মিষ্টি কি?

২০১১ সালে বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন সেন্টার (এনসিবিআই) এর গবেষণা অনুসারে, বিকল্প চিনি হলো একটি ফুড অ্যাডিটিভস বা খাদ্য সংযোজক যা চিনির মতো মিষ্টি কিন্তু শক্তিতে সমপরিমাণ নয়।

দিল্লির সীতারাম ভারতিয়া ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড রিসার্চ এর পরামর্শক ডা. মায়াঙ্ক উপ্পাল এ বিষয়ে বলেন, কয়েকটি কৃত্রিম মিষ্টির মধ্যে রয়েছে নিওটাম, স্যাকারিন, অ্যাসপার্টাম, এসসালফাম, পটাসিয়াম, সুক্রোলোজ এবং অ্যাডভান্টাম। ক্যালরিতে সমান না হলেও উচ্চ-তীব্রতার কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহারের ফলে স্বাদে চিনির সমপরিমাণ হয়। ভোক্তাদের কাছে চিনির বিকল্প এই দ্রব্যগুলো থাকলেও তারা ফলের মতো স্বাস্থ্যকর স্বল্প মিষ্টিযুক্ত বিকল্প কিছু চান। ফলে এগুলো তাদের ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি যুক্ত করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক প্রকার বিকল্প মিষ্টি চিনির থেকেও অনেক বেশি ক্ষতিকারক। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শরীরের ওজন অনুযায়ী বিকল্প মিষ্টি গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। সহজভাবে, একটি শিশু যে পরিমাণ গ্রহণ করবে তা প্রাপ্ত বয়স্কদের চেয়ে কম হবে। তবে এনসিবিআই সমীক্ষা দেখিয়েছে যে, বেশিরভাগ গবেষণায় বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো প্রাণীদের উপর পরিচালিত গবেষণা, স্বল্প পরিসরে করা গবেষণা বা এতে উচ্চমাত্রার ডোজ ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি উদ্বেগের কারণ কেন?

অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি খেলে মনোযোগে সমস্যা, মেজাজ পরিবর্তন, হঠাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া, শরীর জ্বালাপোড়া, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ অ্যান্ড ফুড এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এর মতে, আলাদাভাবে মিষ্টি যুক্ত করলে তা প্রতিদিনে ক্যালোরি গ্রহণের মোট পরিমাণের ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিমাণ ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে কমিয়ে এনেছে। এছাড়া প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে যাদের বিএমআই স্বাভাবিক, তাদের পাঁচ চা চামচের বেশি চিনি না গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কৃত্রিম মিষ্টি গ্রহণ করা কি স্বাস্থ্যকর?

বোস্টনের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. সানজিভ চোপড়ার মতে, কৃত্রিম মিষ্টির পরিবর্তে নিয়মিত চিনি বেছে নেওয়া ভালো। কৃত্রিম চিনি ক্ষতিকর গ্লুকোজ তৈরি করে, কারণ আদতে এটি আমাদের জিআই ট্র্যাক্টের মাইক্রোবায়োমকে পরিবর্তন করে। এটি ওষুধ বিজ্ঞানের আলোচিত বিষয়।

মাইক্রোবায়োমকে ‘দ্বিতীয় মানব জিনোম’ বলা হয়। আমাদের জিআই ট্র্যাক্টে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এগুলোর ওজন প্রায় তিন পাউন্ড।

বাজারে প্রচুর পরিমাণে কম ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টি পাওয়া যায়। এগুলো কি আসলেই স্বাস্থ্যকর? মালিটল (পুষ্টি বার, আইসক্রিমে পাওয়া যায়), এসপার্টাম (ডায়েট কোক) এবং সুক্রলোজ (স্প্লেন্ডা) এর মতো মিষ্টিতে ক্যালরি কম থাকতে পারে। তবে এগুলোর চিনির থেকেও ক্ষতিকর।

মালিটল বদহজম, বমি বমি ভাব, পাকস্থলীতে ব্যথা, ডায়রিয়া সৃষ্টি করে। অ্যাসপার্টাম এর ফলে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি এবং হতাশা হতে পারে। সুক্রলোজ উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যেসব ক্যালোরিমুক্ত মিষ্টি উদ্ভিদ থেকে সংগ্রহ করা হয় তা অন্যগুলোর তুলনায় ভালো। এগুলোতে কার্বস কম থাকে এবং রক্তে শর্করার পরিমাণও বাড়ায় না। এছাড়া শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে। সেই সাথে শরীরের জন্যে উপকারী কোলেস্টেরল এইচডিএল বৃদ্ধি করে।

কয়েকটি স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক চিনির বিকল্পগুলি হলো-

স্টেভিয়া

উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত ক্যালোরিমুক্ত এই মিষ্টি অন্যগুলোর তুলনায় ভালো। এটিতে শর্করার পরিমাণও কম থাকে। এছাড়াও রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি করে না। এটি আপনার শরীরের ট্রাইগ্লিসারাইড হ্রাস করে এবং ভালো ধরণের এইচডিএল বৃদ্ধি করে।

মঙ্ক ফলের নির্যাস

কেটো প্রেমীদের মধ্যে এটি বেশ জনপ্রিয়। প্রাকৃতিক এবং ক্যালোরিবিহীন। মোগ্রোসাইড-ভি নামের এক প্রকার মেগ্রোসাইড একে আরও ইতিবাচক করে তুলেছে। এতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও প্রদাহ বিরোধী এজেন্ট।

জাইলিটল

জাইলিটল হলো প্রাকৃতিকভাবে ব্যবহৃত চিনির অ্যালকোহল বা এক ধরণের কার্ব যা ফল, শাকসবজি এবং শক্ত কাঠের গাছগুলোতে পাওয়া যায়। এটিতে কোনো ধরনের ক্ষতিকারক অ্যাডিটিভস বা কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান নেই। অ্যালকোহলযুক্ত চিনির মধ্যে জাইলিটল অন্যতম। তবে জাইলিটল ছয়টি কার্বনযুক্ত চিনির মতো নয়।

দুরন্ত/২১অক্টোবর/আইডি