তোমাকে ভুলে থাকতে পারছিনা

আসিফ ইকবাল আরিফ:

সভ্যতার জঞ্জালে আটকে পড়ে
ইট পাথরের বুকে আঁকড়ে থেকে
মন ভরে ঠিকমত নি:শ্বাস নিতে পারছিনা।
মুদ্রাক্ষরের ভণ্ডামো আর কলমের মাস্তানিতে
গহীন অন্ধকারের তলানীতে জীবনের সব বাতিঘর।

উন্মুক্ত হয়েছে যত সব নেশার চোখ;
মানুষকে বোকা বানানোর
আর দিন রাত হেসে হেসে লোক ঠকানোর।
এই প্রতারণার বিস্তৃত জালে
মন আর আটকে থাকতে চাচ্ছেনা।

সব জাল ছিঁড়ে ফেলে মন চায় ছুটে যেতে
তোমার কুয়াশার সকালে শিমুল বনে
আর সন্ধ্যের ঝিঁঝিঁ পোকার গানে।
আমি তোমাকে ভুলে থাকতে পারছিনা।
তোমার ছায়া ঘেরা ঘরবাড়ি ফসলের মাঠ
বকুলের ঘ্রাণ আর কোকিলের গান
এই মায়া মন থেকে সরানো যাচ্ছেনা।

তোমার নদী ভরা জলে
আমার হৃদয়ে জড়ানো সেই ডুব সাঁতার
সে খেলা মন থেকে মুছতে পারছিনা।
তোমার নদীর তীরের সেই বিদ্যালয়
যেখান থেকে হলো শুরু সব নৃত্য;
আমার আমি হওয়ার এক বিষ্ফোরণ।

তোমার দেওয়া সে ঋণ রত্ন সমান
আমার সেই স্বরে অ স্বরে আ…..
এক দুই তিন…. ক খ গ… আর এ বি সি……..
বাজিয়েছে কত যে আমাকে গড়ার বীণ।

কি করে তোমাকে ভুলি বলো?
প্রতিদিন প্রতিঘাতে আমি সেগুলোতেই তো
আমার আমিকে চিনি, তোমাকে চিনি
আর জানি জগতের সব ভালো-মন্দ
প্রেম বিপ্লব আর বিরহ-ব্যথা যত।

তোমার বিলের কালো জলে
ভেসে থাকা সবুজ ধানের পাতায়
আর ডুবে যাওয়া ধানের ক্ষেতে
বর্ষায় ফুটে ওঠা যত শাপলার বাহারে
মেতে থেকেছি কত অবেলা দুপুর!

সেই কাদাজল ভেঙ্গে হেঁটে হেঁটে চলার
আবেশ যে এখনো আমার পায়ে লেগে আছে।
মাঝে মাঝে খুব মন খারাপে বুকের পাঁজর খুঁড়ে
আঙুলে যে পাই সেই শাপলা তোলার গন্ধ।
তোমার মেঠো পথের টান আর ভাটিয়ালী গান

মিষ্টি রোদের সকাল হিজলের বন ঘুঘুর গান
বাশ বাগানের মাথার উপর ভোরের সূর্য
চাঁদনী রাতের লুকোচুরির খেলা
বাবার চোখ রাঙানি আর মায়ের অভিমান
আমাকে ভাসায় কাতর অভিমানে
আমি পাগলের মত শুধু কাতরাতে থাকি
আমি তোমাকে ভুলে থাকতে পারছিনা।

তোমাকে ভুলে থাকা যায় কি বলো?
তোমার মাটিতেই মিশে আছে
আমার প্রথম প্রেমের উষ্ণ চুম্বন।
চম্পা ফুলে আমার প্রথম প্রেম ছোঁয়া!

সেটার সাক্ষ্য তোমার বুকের দক্ষিনের আমবাগান
পূবের জারুল বন পশ্চিমের তালতলা
আর উত্তরের নদীর তীরে বিস্তৃত ফসলের মাঠ।

তোমার মাটিতেই মিশে আছে
আমার প্রথম প্রেম ভেঙে যাওয়ার আঁছড়ে আঁছড়ে
কান্নার যত সব নোনাজল নির্ঘুম রাত।
আবার তোমার মাটিতেই মিশে আছে
জুঁই ফুলে আমার দ্বিতীয় প্রেমের সাফল্য।

তোমার ধানক্ষেতের সাদা বক পানকৌড়ি
বাশবাগানের শালিক বাবলা গাছের ফিঙে
তাল গাছের বাবুই টিয়া আর ঘরের চালের চড়ুই
তারা জানে চম্পা ঝরে যাওয়ার পরে
জুঁই কতটা আমার হয়েছিলো আর আমি কতটা তার।

জুঁই আর আমি এক সাথে থাকিনি
ছেড়ে গিয়েছে সে ছেড়ে এসেছি আমি
আমি চম্পাকে ভুলিনি, জুঁইকে ভুলিনি
ভুলবো কি করে আমি যে তোমাকেই ভুলতে পারিনি;

ভুলবো কি করে মনের উঠোনের সবটাই যে তোমার।
তাই তোমাকে ভুলতে পারছিনা , ভুলে থাকতে পারবোনা।

শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

দুরন্ত/৯সেপ্টেম্বর/পিডি