তৎকালীন ঢাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান জেলহত্যার স্মৃতিচারণ করলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতীয় চার নেতাকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার দুদিন পর তাঁদের জমাট বাঁধা রক্ত পরিষ্কার করেন শ্রমিকরা। ৫ নভেম্বর সকালে এই কঠিন কাজটি করেছিলেন পুরান ঢাকার মোক্তার কন্ট্রাক্টরের সরবরাহ করা আটজন শ্রমিক।

তাঁদের যখন কেন্দ্রীয় কারাগারের হত্যাকাণ্ডের স্থানে নেওয়া হয় তখন তাঁরা ড্রেনের জমাটবদ্ধ লাল রক্ত দেখে থমকে যান। চার নেতার কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র এ সময় ওই কক্ষে ছড়িয়ে ছিল। হত্যার বীভৎসতা দেখে তাঁরা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। প্রায় দুদিন সময় নিয়ে শ্রমিকরা শহীদদের ওই রক্ত পরিষ্কার করেন।

জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যার দুদিন পর ৫ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন ঢাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) শহীদুজ্জামানের ওপর হত্যাকাণ্ডের স্থান পরিষ্কারের দায়িত্ব পড়ে।

সেই ভয়াল স্মৃতির কথা বর্ণনা করেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘জেল হত্যাকাণ্ডের এক কি দুদিন পর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আমার ডাক আসে। বলা হয় কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে যেতে। আমি পুরান ঢাকার মোক্তার কন্ট্রাক্টরকে ৮-১০ জন শ্রমিক নিয়ে কারাগারে আসতে বলি। তিনি আটজন শ্রমিক সঙ্গে নিয়ে এলে আমরা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকি। জেলার আমাদের হত্যাকাণ্ডের স্থানে নিয়ে যান। নতুন জেলের এক নম্বর কক্ষের কাছে পৌঁছে দেখি ড্রেনে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। তাই দেখে শ্রমিকরা আঁতকে ওঠেন।’

শহীদুজ্জামান ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বোন খাদিজা হোসেন লিলির সেজো মেয়ে হাবিবা হোসেন ডলির স্বামী। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পাঁচ দিন আগে ১০ আগস্ট তাঁদের বিয়ে হয়। ১৩ আগস্ট রাতে তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে মামাশ্বশুর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন।

দুদিন পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শ্যালিকা রোজী জামালকেও (শেখ জামালের স্ত্রী) হারান তিনি। শহীদুজ্জামান ১৫ই আগস্টের ক্ষত তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এর মধ্যেই আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতা তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয়।

ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শহীদুজ্জামান আরো বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কারাগারের ওই নতুন জেলখানা তাঁরই তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর নির্দেশে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব জেলখানার মধ্যে অবস্থিত সাবেক আইজি প্রিজন অফিস এলাকায় ১৫টি নতুন সেল করে দেওয়ার জন্য বলেন। পরে একদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এ নিয়ে প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেন।’ তিনি জানান, সেলগুলোতে রাজবন্দিদের রাখা হবে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী শহীদুজ্জামান নতুন জেলখানার ওই কক্ষগুলো নির্মাণ করেন।

প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান তখন নগর গণপূর্ত বিভাগের ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগে কর্মরত ছিলেন। এই উপবিভাগের আওতায় ছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের স্থান এক নম্বর কক্ষে এত রক্ত ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। টয়লেটের ভেতরে দরজার কাছেও রক্ত ছড়িয়ে ছিল। এসব স্থান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিষ্কার করতে হয়। তারপর কক্ষটি তালাবদ্ধ করা হয়। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকা উপবিভাগে কর্মরত ছিলাম। এ সময় যতবারই জেলখানায় গেছি ওই কক্ষটি বন্ধ দেখেছি।’

শহীদুজ্জামান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থাকার সময় বিএনপি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করে। স্বাধীনতার স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক থাকার সময় ২০০৩ সালে শুধু ‘বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নি জামাই’ হওয়ায় তাঁকে দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে বরখাস্ত করা হয়। ২০১০ সালের ১৩ মে তিনি এই মামলা থেকে অব্যাহতি পান।