থানা হাজতে আসামী রাখার নিয়ম

রানা খায়রুল ইসলাম,

ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় এ উপমহাদেশে থানার হাজতে আসামীকে নির্যাতনের ঘটনা ডাল-ভাতের মত ছিল। ব্রিটিশরা চলে গেলেও রেখে গেছে এ অবৈধ প্রথাটি। ‘৪৭ এর পর থেকে পাকিস্থান শাসিত এ দেশে ‘৫২ র ভাষা আন্দোলন, ‘৬২ র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬ র ছয় দফা আন্দোলন, ‘৬৯ এর গন-অভ্যূথান, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এদেশের অসংখ্য মানুষ থানার হাজতে বিচারবহির্ভূত পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইনের ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে শাসকগন।

শুধু তাই নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ অবধি এর ব্যাপকতা সামান্যও কমে নি।স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর আজও পত্রিকার পাতা খুললে এরকম অহরহ ঘটনা চোখে পড়ে। যেমন, বাসা থেকে সুস্থ আসামীকে ধরে এনে অসুস্থ বানিয়ে দেয়, গুম করে দেয়, ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে, আসামীর বাসা থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষ, আসামীকে অন্য মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি, আসামীকে অস্ত্র, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক মামলার হুমকি দেয়, হাজতে নেওয়ার পর আসামীর মৃত্যু সহ আরো কত কি!

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার বা আটক করার পর হাজতে আসামি বা আটককৃত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়৷ এই সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে৷

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মোট ১৮ জন মারা গেছেন৷ ২০১৮ সালে ১৭ জন ও ২০১৭ সালে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷

বর্তমান বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে (ফৌজদারি কার্যবিধি, পিআরবি সহ অন্যান্য আইন) থানার হাজত খানায় আসামী রাখার নিয়ম সম্পর্কে বেশ কিছু নির্দিষ্ট বিধান আছে।

ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৫১ ধারা মোতাবেক কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার পর যদি তার জামিনের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। এক্ষেত্রে আসামীকে হাজত খানায় রাখর প্রয়োজন নাই।

যদি আসামীর জামিনের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে তার দেহ তল্লাশী করে পরিধেয় বস্ত্র ব্যতীত যা পাওয়া যাবে তা হেফাজতে নিতে হবে এবং এর একটি তালিকা আসামীকে দিতে হবে।
আসামী যদি মহিলা হয় তবে ফৌজদারী আইনের ৫২ ধারা অনুসরণ করে দেহ তল্লাশী করতে হবে এবং মহিলা আসামীর নিকট হতে চুড়ি, শাখা, সঙ্খ নেওয়া যাবে না।

আসামীর নিকট কোন মারাত্মক অস্ত্র পাওয়া গেলে ফৌজদারী কার্যবিধি -৫৩ ধারা মোতাবেক তা হেফাজতে নিতে হবে এবং একটি জব্দ তালিকা তৈরী করতে হবে।

গ্রেফতারকৃত আসামী যদি অসুস্থ হয় তাহলে তাকে আইন মোতাবেক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।আসামীর দেহে বা শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন থাকে তাহলে পিআরবি ২৬২ বিধি মোতাবেক নিরপেক্ষ স্বাক্ষীদের উপস্থিতিতে উক্ত আঘাতের চিহ্ন সনাক্ত পূর্বক জিডিতে এন্ট্রি করতে হবে।

হাজত খানার ভিতরে প্রবেশ করে আত্মহত্যা করার মত কোন জিনিস বা কোন প্রকার রশি, লাঠি থাকলে তা সরিয়ে নিতে হবে এবং হাজত খানার দরজা জানালা ঠিক আছে কি না তা দেখতে হবে। পিআরবি ৩২৯ মোতাবেক হাজত খানার প্রহরী নিয়োগ করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।