‘দুর্নীতি ও নারী নির্যাতন মহামারী চলছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের মতোই দেশে ‘দুর্নীতি-নারী নির্যাতনের’ ঘটনা ঘটছে।

সোমবার ঢাকায় এক মানববন্ধনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, বাংলাদেশে এখন শুধু একটা মহামারী চলছে না। শুধু কোভিড-১৯ মহামারী না, বাংলাদেশে দুর্নীতির মহামারী চলছে, বাংলাদেশ নারী নির্যাতনের মহামারী চলছে। এই মহামারী থেকে আমাদেরকে রক্ষা পেতে হবে, জনগণকে রক্ষা করতে হবে।

দ্রব্যমূল্যের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে নজরুল ইসলাম খান বলেন, পেঁয়াজের দাম শখানেক টাকার কাছাকাছি। কোনো শাক-সবজি ৮০-৯০-১০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। আমি রবিবার এক বাজারে মলা মাছের দাম করছি, বাতাসি মাছের দাম করছি- প্রায় ৭০০ টাকা কেজি। তাহলে সাধারণ গরিব মানুষ খাবে কী?

“এমনকি যারা চাকরি-বাকরি করেন, হালাল উপার্জন দিয়ে তারা চলবেন কী করে? ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার দেবেন কী করে? তাদের লেখাপড়ার খরচ চালাবেন কী দিয়ে? তাদের চিকিৎসা করাবেন কী দিয়ে? ভাবুন একবার।”

২০১০ সালের তুলনায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আয় কমেছে বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা।

তিনি বলেন, “পারিবারিক পর্যায়ে ব্যক্তির আয় ২০১০ সালে যা ছিল তার চেয়ে প্রায় শতকরা ৭ ভাগ কমে গেছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন তাদের আয় ২০১০ সালের তুলনায় কমেছে শতকরা ১২ ভাগেরও বেশি। এক হাজার টাকা যে বেতন পেত, তার ১২০ টাকা কমে গেছে।

“যখন উপার্জন কমে যাচ্ছে তখন যদি জিনিসের দাম বাড়ে তখন তো কষ্ট বেশি হয়। এই সাধারণ সোজা কথাটা সরকারকে বুঝতে হবে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সবচেয়ে ধনী ৫ ভাগ মানুষ, তাদের আয় বেড়েছে শতকরা ৫৭ ভাগ। আর যারা সবচেয়ে গরিব সে রকম শতকরা ৫ ভাগের আয় কমেছে শতকরা ৫৯ ভাগ। এটা আমাদের কথা না, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ।

“২০১০ সালে আমাদের দেশের সবচেয়ে গরিব যারা তাদের আয় ছিল ১৭৯১ টাকা, এখন তাদের আয় হল ৭৩৩ টাকা।”

নজরুল ইসলাম খান বলেন, “বিআইডিএস তার রিপোর্টে বলছে যে, গত কয়েক মাসে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়ে গেছে। আগে তো গরিব ছিলই।

“এডিবি তার রিপোর্টে হিসাব করে বের করেছে, এশিয়ার ৩০টি দেশের মধ্যে সুখে আছে মানুষ কতটা। সেই হিসাবে বাংলাদেশের স্থান হল ২৬তম। অর্থাৎ আমাদের চেয়ে কষ্টে আছে আর মাত্র চারটা দেশ। এত কষ্টে আছে বাংলাদেশের মানুষ!

“দি ইকোনোমিস্ট তাদের রিপোর্টে বলছে, ১২৫টা দেশের মধ্যে তারা গবেষণা করেছে। সেখানে তারা ৪৩টা দেশ পেয়েছে যেখানে প্রবৃদ্ধির হার বেশি কিন্তু সুখের হার কম। বাংলাদেশ তার মধ্যে একটা।”

সিলেটে এমসি কলেজে নববধূ ধর্ষিত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নজরুল বলেন, “এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘আমি অসহায়’। আপনি অসহায় হতে পারেন কিন্তু যাদের সামর্থ্য আছে, সাহস আছে তারা তো নামতে পারে ময়দানে।

“আর যদি তারাও না নামে তাহলে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা মাঠে নেমেছে, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মাঠে নেমেছে, ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে যারা মাঠে নেমেছে, সেই জনগণ মাঠে নামবে, নামবেই। এটাই বাস্তবতা, এটাই বার বার প্রমাণিত।”

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ক্ষমতাসীনদের সেঞ্চুরির শেষ নেই। শুধু দ্রব্যমূল্যে সেঞ্চুরি নয়, নারীর সম্ভ্রমহানির সেঞ্চুরিতে ঐতিহ্য রয়েছে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা জসিম উদ্দিন মানিক নারীর সম্ভ্রমহানিতে সেঞ্চুরি করেছিল।

“আর্তচিৎকার করছে এমসি কলেজের সেই দম্পতি; তার স্বামীর কাছে যখন ফিরে এসেছে তার নির্যাতনের মাধ্যমে, বর্বর বলাৎকারের মাধ্যমে তখন তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে তার আর্তনাদ, কান্না করেছে। আর এদিকে গণভবনের চলছে প্রধানমন্ত্রী জন্মদিনের উৎসব। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় শুধু আপনার জন্মদিনের খবর। বাকশাল একদলীয় শাসন থাকলে কারও কোনো খবর নেই।”

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “তথ্যমন্ত্রীর একটা ফ্যাক্টরি আছে। সেই ফ্যাক্টরি হচ্ছে গুজবের ফ্যাক্টরি, মিথ্যা কথা রচনার ফ্যাক্টরি। তিনি প্রতিদিন বিএনপির বিরুদ্ধে, জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

“আমি বলব, নিজেরা নিজেদের আয়নার দিকে তাকান। আপনারা যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছাত্রলীগের নেতারা নতুন দম্পতির নববধূকে হোস্টেলের রুমে নিয়ে নির্যাতন করল। আজকে মানুষ কাঁদছে, বিশ্ব বিবেক কাঁদছে। এত পাপ, এত অন্যায় জনগণ সহ্য করবে না।”

‘ইনডেমনিটি’ নাটকের মাধ্যমে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘ভাবমূর্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে’ লিপ্ত হয়েছে মন্তব্য করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “যারা মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকারী আন্দোলনের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যারা নাটক লিখছেন। আজকে তো টাকা পাচ্ছেন, পয়সা পাচ্ছেন। জানি যে আপনাদের কিছু হবে না।

“আমি বলে দিয়ে রাখি, এটা প্রত্যাহার করুন। না হলে যে টেলিভিশনে এগুলো প্রচার হবে, যে জায়গায় এসব প্রচার হবে, জাতীয়তাবাদী শক্তির জনগণ তাদের ঘেরাও করবে।”

নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের উদ্যোগে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই মানববন্ধন হয়।

সংগঠনের সদস্য আজিজুল বারী হেলালের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব নিপুণ রায় চৌধুরীর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, রফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর হোসেন, আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, বিলকিস ইসলাম, রবিউল ইসলাম রবি প্রমুখ নেতারা বক্তব্য রাখেন।

এই মানববন্ধনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করেন নেতা-কর্মীরা।

এদিকে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাফরুল হাসানের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল হয়। এতে নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, রুহুল কবির রিজভী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মীর সরফত আলী সপু, আনোয়ার হোসেইনসহ শ্রমিক দলের নেতারা বক্তব্য রাখেন।