নদী ও সাগর ভ্রমণে যা করবেন না

অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম:

আমরা নদী ও সাগরে ভ্রমণ করি। এই দীর্ঘ ভ্রমণে প্রায়শই আমরা অসচেতন থাকি। পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে নজর দিই না।বরিশাল, চাঁদপুর, খুলনা সহ অনেক জায়গায় আমরা নদীপথে ভ্রমণ করি। আবার সাগরপথেও ভ্রমণ করি, যেমনঃ কক্সবাজার বা টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাতায়াত করি।তাছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নদী ও সাগর পথে আমরা ভ্রমণ করি। আমাদের দেশ ছাড়াও বিদেশে আমরা সাগর পথে ভ্রমণ করি।

ভ্রমণের সময় অনেকে তাদের পানির প্লাস্টিক বোতল ও ব্যবহার শেষে পলিথিন নদী ও সাগরে নিক্ষেপ করে। আবার বিভিন্ন আবর্জনাও পানিতে ফেলা হয়। এগুলো পর্যটক ছাড়াও জলযানের কর্মচারীরাও ভ্রমণ শেষে পরিচ্ছন্নতার নামে নদী ও সাগরে নিক্ষেপ করে। যা পরিবেশের জন্য তথা নদী ও সাগরের পানি ও প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা দেখি ব্যবহার করা প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় বস্তু নদী ও সাগরে নিক্ষেপ করার কারণে পানি যেমন নষ্ট হয় তেমনি পানিতে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে নিপতিত হয়।পরিবেশ বিঞ্জানী ও পরিবেশ কর্মীরা এ বিষয়ে সারাবিশ্বের রাষ্ট্র প্রধানদেরকে সতর্ক থাকতে ও জলবায়ুর ঝুঁকি থেকে পৃথিবীকে রক্ষার বিষয়ে আহবান জানায়। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার- সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমেও সকলকে সচেতন করা হয়।

কিন্তু আমরা সচেতন হচ্ছি না বরং জলের পরিবেশ নষ্ঠের জন্য দায়ী। অনেক সাগরে মৃত তিমি,হাঙ্গর সহ অনেক জলজ প্রাণী ভেসে উঠে।তাদের পেটের মধ্যে পাওয়া যায় শিষা,প্লাস্টিকের বিভিন্ন দ্রব্য,পলিথিন, জালের টুকরা সহ বিভিন্ন দ্রব্য।আর এরই কারণে তাদের অকাল মৃত্যু ঘটে।যার কারণে জলের জীব বৈচিত্র্য নষ্ঠ হতে বসেছে। তাই সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

নদী ও সাগরের ডলফিন ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছে অসুস্থ জলজ পরিবেশের কারণে। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত জরিপে হালদা নদীতে ডলফিন ছিল ১৭০ টি।গত ১৩/১০/২০ তারিখ পর্যন্ত ২৭ টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। এটি জলজ পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য বড়৷ ধরনের হুমকি।

অপরদিকে নদী এ সমুদ্রের মাছও এ ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। চট্টগ্রাম ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় জনপ্রিয় সামুদ্রিক মাছ সার্ডিন,চিংড়ি ও লইট্রা মাছের দেহে, সামুদ্রিক সবুজ শামুক ও কাঁকড়ার পাকস্থলীতে প্লাস্টিকের কণা জাতীয় ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া গিয়েছে।

অপরদিকে স্বাস্থ্যবিদরা বলেন, প্লাস্টিক কণা যেকোনো প্রাণীর জন্যই ক্ষতিকর। এর ফলে ক্যানসার,শ্বাসকষ্ট ও হজমের সমস্যাসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে, যা নিয়মিতভাবে খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে নানারোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

লইট্রা শুঁটকিসহ কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে বছরে প্রায় ৩১০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়।গবেষক দল গবেষণায় দেখেছে যে,মূলত পলিয়েস্টারের তৈরি মাছ ধরার জাল, কর্কশিট,খাবারের প্যাকেট,পলিথিন, পানির বোতল ও বিভিন্ন আসবাবপত্র থেকে এই প্লাস্টিক কণার উৎপত্তি। সাগরে ফেলার কারণে এমনকি নদী থেকেও এসব দ্রব্য ঢেউয়ের তোড়ে সেগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানিতে ভেসে বেড়ায়।আর মাছ ও প্রাণী তা খেয়ে নিচ্ছে তাদের খাদ্য মনে করে।আমরা সে মাছ খাওয়ার ফলে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা আমাদের দেহে প্রবেশ করে।যার ফলে বিভিন্ন রোগে আমরা আক্রান্ত হচ্ছি।

তাই প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ এটি ঘুরেফিরে আমাদের দেহে প্রবেশ করছে।

অতএব, পর্যটক সহ সকলে আমরা নদী ও সাগরে প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় বস্তু ফেলা থেকে বিরত থাকি এবং অন্যকেও বিরত রাখি।

আসুন নদী ও সাগরের পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসি সুস্থ্য ও নির্মল জীবন উপভোগ করি।

লেখকঃ শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

দুরন্ত/২০অক্টোবর/আইডি