নির্মল বন্ধুত্ব চাই!

মাহমুদ হাসান:

‌‘বন্ধু’ শব্দটির মাঝে যেমন ভালোবাসার আকুতি আছে তেমনি হৃদয়ের নৈকট্য ও আছে। দেনা পাওনার হিসাব যেখানে মুখ্য, সেই বন্ধুত্ব কখনো নির্মল হয় না। সম্পদ আর ঐশ্বর্যের প্রতিযোগিতায় নির্মল বন্ধুত্ব যেন সমাজ ব্যবস্থায় ক্রমেই দূরুহ হয়ে উঠছে।

‘দোস্ত’ শব্দটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। সহপাঠী বন্ধুকে আমরা অনেকে দোস্ত বলে সম্বোধন করি। কেউ কেউ আবার এটিকে শুদ্ধ বাংলার বিপরীতে অনেকটা সংস্কৃতির কথ্য রুপ বলেই মনে করেন। তবে এককালের গ্রামীণ সমাজে এই ‘দোস্ত’ শব্দটি বিশেষ সামাজিক সম্পর্কে ব্যবহৃত হতো।

খেলার সাথী, স্কুলের সহপাঠী সবাই বন্ধু হলেও ‘দোস্ত’ হতো না। ‘দোস্ত বা দোস’ শব্দটির মাধ্যমে দুটো পরিবারের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতো। দেনা-পাওনা, ঐশ্বর্য আর ক্ষমতার প্রতিযোগিতা কোন কিছুই এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতো না।

গবেষণা নয় অভিজ্ঞতার আলোকেই আমি বন্ধুত্বকে বিশ্লেষণ করতে চাই। আয়তনে ছোট হলেও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময়। শৈশবে দেখেছি ছোট ছেলেটি হয়তো তার বাবা/ মাকে বলেছে কোন এক বন্ধু কে সে ‘দোস্ত,’ বানাতে চায় অথবা বাবা/মা নিজেই আগ্রহী হয়ে একই গ্রামের কারো সন্তানের সংগে নিজ সন্তানের ‘দোস্তির’ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে বাহারী খানাপিনার আয়োজনে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজের মানুষের অংশগ্রহণে এই ‘দোস্তির’ সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠিত হতো। এটি শুধুমাত্র ছেলেদের মধ্যে সীমিত ছিল তা নয় মেয়েদের মধ্যেও এ বিশেষ সম্পর্কের প্রতিফলন ছিল। হবিগঞ্জের আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে ছেলেদের মধ্যে একে অপরকে ‘দোস্ত’ বা ‘দোস’ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ‘বৈনারী’ বলে সম্বোধন করতো। এ ধরনের সম্পর্কগুলো মূলত অনাত্মীয়দের মধ্যেই গড়ে উঠতো।

সহজ সরল অর্থে বন্ধুত্বের ই বিকশিত রূপ ছিল দোস্ত বা বৈনারীর সম্পর্ক। তবে এই বিশেষ সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন এতটাই শক্তিশালী ছিল, যে কোনো ধরনের বৈষয়িক, আর্থিক এমনকি আদর্শিক ভিন্নতায়ও এ সম্পর্কের মধ্যে কোন ধরনের ফাটল ধরানোর সুযোগ ছিল না।

দোস্তি বা বৈনারীর সম্পর্ক বিদ্যমান দুটো পরিবার একে অপরের জন্য যে কোন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতো। আর এ ধরনের সম্পর্কের অনুশীলনে শিশুকাল থেকেই সমাজে এক ধরনের ত্যাগ ও সহমর্মিতার শিক্ষা চালু হয়ে যেত।

পরিবারের কাছে শোনা একটি গল্পের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় বিকশিত বন্ধুত্ব বা ‘দোস্তির’ সম্পর্কের স্বরূপটি প্রিয় পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের সবচেয়ে বৃহত্তম অংশটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করেছে।

আর অতি ক্ষুদ্রতম একটি অংশ পাক হানাদারদের সহযোগীতায় রাজাকার শান্তি বাহিনীর হয়ে স্বাধীনতার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আমার শিক্ষক পিতা আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ছিলেন। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নানা শংকা সংশয়ে আমাদের পরিবারটি দীর্ঘ নয়মাস সময় পার করতে হয়েছে।

বাল্যকালে আমার পিতার সঙ্গে সাদ উল্লাহ নামে একজনের ‘দোস্তির’ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ঘটনা পরস্পরায় আদর্শিক ভিন্নতায় ১৯৭১ সালে সাদউল্লাহ ভয়াবহ প্রকৃতির রাজাকার হয়ে উঠলেও তিনি আমাদের পরিবারের জন্য চরম দুঃসময়েও কোন ক্ষতির কারন হয়ে ওঠেননি। যদিও যুদ্ধ শেষের কোন একদিনে নির্জন খালের পাড়ে তার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছিল।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও অমলিন বন্ধুত্বের নানা উদাহরণ দেখেছি। ছাত্র জীবন শেষে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার সময় বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ বেদনায় হাহাকার করে কাঁদতে দেখেছি। স্বার্থহীন এই সম্পর্কগুলোর মাঝে লাভ লোকসান দেনা পাওনার হিসাব ছিল না।

ত্যাগ, ভালোবাসা, সহমর্মিতায় ভরপুর এই সম্পর্কের মাঝে হ্রদয়ের আকুতি ছিল, বিশ্বস্ততায় পরিপূর্ণ এমন সুমধুর সম্পর্কই তো একটি সুখী সমাজ ব্যবস্থার অনুসঙ্গ হতে পারে। বাংলাদেশের চলমান সমাজ ব্যবস্থায় মৌলিক সামাজিক অবকাঠামোতে ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র বিদ্যমান।

অর্থনীতির অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রগুলো যেন দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, পরিবারের সংগে পরিবারের নির্মল বন্ধুত্বই ক্ষয়িষ্ণু এই সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যাশার অবলম্বন হতে পারে। বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েও করোনার ভয়াবহ করালগ্রাসে বিনা চিকিৎসায় অনেককেই চিরবিদায় নিতে হয়েছে। তাই অবৈধ বিত্ত বৈভব নয় হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার আকুতিতে ভরপুর নির্লোভ, নির্মোহ,আর নির্মল বন্ধুত্ব ই কাম্য!

লেখক. কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

দুরন্ত/১০মে/পিডি