“পর্যটন, পর্যটক ও করোনাকালীন সতর্কতা”

অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম:

পর্যটনঃ– পর্যটন যার ইংরেজি Tourism। যখন বিনোদন, অবসর সময় কাটানো অথবা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মানুষ এক স্হান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে তখন একে পর্যটন বলে।বর্তমানে এটি বিশ্বে একটি শিল্প হিসেবে পরিগণিত।

যিনি আমোদ-প্রমোদ বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে অন্যত্র ভ্রমণ করেন তিনি পর্যটক নামে পরিচিত হন। এতে ভ্রমণ পিপাসুরা বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম, উল্লেখযোগ্য ভবন, নিত্য নতুন ভাষা সম্পর্কে পরিচয় লাভ, নতুন সংস্কৃতির সাথে পরিচয়সহ হরেক রকম রন্ধন প্রণালীর স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ পান।

ট্যুরিস্ট বা পর্যটক শব্দটির প্রথম প্রয়োগ শুরু হয় ১৭৭২ সালে এবং ট্যুরিজম বা পর্যটন শব্দের ব্যবহার হয় ১৮১১ সালে।

পর্যটকের সময়কালঃ– ১৯৩৬ সালে রাষ্ট্রসংঘ বিদেশি পর্যটকের সময়কাল নির্ণয় করতে যেয়ে বলেছে, বাহিরের দেশে কমপক্ষে ২৪ ঘন্টা অবস্হান করলে তারা পর্যটক হিসেবে বিবেচিত হবে।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ এই সময়কাল পরিবর্তন করে বলেন, সর্বোচ্চ ৬ মাস অবস্থানকালীন সময়কালে একজন ব্যক্তি পর্যটকের মর্যাদা উপভোগ করতে পারবেন।

অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ—- সারাবিশ্বে বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করে থাকেন।
অর্থনৈতিক সহায়ক সেবাখাত হিসেবে পর্যটনের সাথে জড়িত রয়েছে বিপুল সংখ্যক লোক।এতে উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছেঃ———- পরিবহন ব্যবস্হা,থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হাসহ হোটেল- মোটেল,রিসোর্ট—– এবং আমোদ- বিনোদনের জন্য চিত্তবিনোদন পার্ক, ক্যাসিনো,শপিংমল, সঙ্গীত মঞ্চ ও থিয়েটার।

বাংলাদেশে পর্যটনঃ—–১৯৬০ এর দশকে বাংলাদেশে পর্যটনের সূত্রপাত ঘটে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আকর্ষণে।
১৯৭৩ সালে পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা —২৫ মিলিয়ন
২০১৬ —————————————-১২৩৫ মিলিয়ন
২০১৯ ———১৩৯ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার প্রায়।
বিগত ৬৭ বছরে পর্যটকের সংখ্যা ৫০ গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে জিডিপি খাতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা।
এ খাতে কর্মসংস্থান তৈরী হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার।
২০১৮ সালে ধারনা করা হয় বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করে।
আর দেশি পর্যটক প্রায় ৪ কোটি।

আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ” বিশ্ব পর্যটন দিবস”।
১৯৮০ সাল থেকে সকল সদস্য দেশ এটি পালন করে আসছে।

পর্যটকদের করোনাকালীন সতর্কতা:

২০২০ জানুয়ারি থেকে সারাবিশ্বে কোভিড-১৯ নামক মহামারির দাপট চলতে থাকে যা বর্তমানেও সক্রিয়। বাংলাদেশে ৮ মার্চ থেকে এর বিস্তার শুরু হয়ে এখনো মহাপ্রতাপে বিদ্যমান।এর ফলে সকল ধরনের কর্মকাণ্ডে নেমে আসে স্হবিরতা। বাংলাদেশে জীবন ও জীবীকার প্রয়োজনে ধীরে ধীরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছু স্বাস্হবিধি মেনে খুলে দেয়া হয়।
মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে বন্ধী থেকে অস্হির হয়ে পড়ে।তাই বিনোদনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে।মানসিক স্হীরতা আনয়নের জন্য ভ্রমণ একটি বড় ধরনের বিনোদন মাধ্যম। পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের পর্যটন স্হানসমূহ খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও সকল দিক বিবেচনা করে পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদেরকে স্বাস্হবিধি মেনে পর্যটকদের চাহিদার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে পর্যটন স্হানসমূহ খুলে দেয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু মহামারীর প্রকোপ এখনো না কমাতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও পর্যটকদের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি প্রথমে পর্যটন সংশ্লিষ্টদেরকে সতর্কতা অবলম্বন করে পর্যটকদের সুরক্ষা প্রদান করার আহবান জানাই।
——————————————————-১। পরিবহনঃ সকল ধরনের পরিবহনে পর্যটক উঠানোর পূর্বে তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা,গাড়ির ভিতর জীবাণু নাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করা,হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা,পর্যটকদের মাস্ক পরিধান করতে বাধ্য করা,যতদূর সম্ভব শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করা।
অনুরূপভাবে পরিবহন সংশ্লিষ্টদেরকেও উপরোক্ত স্বাস্হবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
২। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট সংশ্লিষ্টদের সতর্কতাঃ–
২.১। পর্যটকরা হোটেলে উঠার পূর্বে তাদের শরীরের তাপমাত্রা অবশ্যই মেপে নিতে হবে।
২.২। হোটেলের কক্ষ ২৪ ঘন্টা পূর্বেই জীবাণুমুক্ত করে রাখার ব্যবস্হা করতে হবে।
২.৩। হোটেলের বালিশ,বিছানাসহ সব কিছু ধৌত করে জীবানমুক্ত করে রাখতে হবে।
২.৪। হোটেলের ওয়াশ রুম প্রতিদিন জীবানুমুক্ত করে রাখার ব্যবস্হা করতে হবে।
২.৫। হোটেলের ফোন,টিভি, এসি, সোফাসেটসহ সকল ব্যবহার্য জিনিসপত্র সবসময় জীবানুনাশক স্প্রে ছিটাইতে হবে।
২.৬। প্রতিবার আসা- যাওয়ার সময় তাপমাত্রায় মেপে নিতে হবে। বারবার হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজিং করার জন্য পর্যটকদের সবিনয়ে অনুরোধ করতে হবে।
২.৭। হোটেল ম্যানেজারসহ সকল অফিসার, হোটেলের সেবা প্রদানকারীরা সকলেই যথাযথ স্বাস্হবিধি মেনে সেবা প্রদান করতে হবে।
২.৮। খাওয়া পরিবেশনকালে সকল কিছু জীবাণুমুক্ত করে পরিবেশন করতে হবে।
২.৯। ৩/৪ টি হোটেল মিলে ১ জন ডাক্তার রাখা উচিত, যাতে কেউ অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় স্বাস্হ্যসেবা প্রদান করা যায়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো পর্যটকদের অবশ্যই মেনে চলা উচিত এবং এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনরূপ বাধাঁ প্রদান করা বা হাংগামা সৃষ্টি করা ঠিক হবে না
৩। পর্যটন স্হানসমূহঃ- পর্যটন স্হানসমূহে যাতে পর্যটকরা স্বাস্হবিধি মেনে চলে সেদিকে ঐ পর্যটন স্হানের স্বেচ্ছাসেবকরা তৎপর থাকবেন।

আইন রক্ষা বাহিনী সর্বদা সকল বিষয়ের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

পর্যটকদের সতর্কতাঃ–

১। – পর্যটকরা সকল ক্ষেত্রে স্বাস্হবিধি মেনে চলবে।

২। মাস্ক,সাবান,হ্যান্ড স্যানিটাইজার,জীবানুনাশক স্প্রে, প্রয়োজনীয় ঔষধ সর্বদা সাথে রাখতে হবে।

৩। জীবানুমুক্ত কাপড় সঙ্গে রাখতে হবে।

৪। পরিবহনের লোকেরা স্বাস্হবিধি মেনে চলে কিনা সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

৫। হোটেল- মোটেল ও রিসোর্টে যথোপযুক্ত স্বাস্হবিধি মেনে রাখা হয় কিনা সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সেগুলো আদায় করে নিতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে আইন সংস্হা বাহিনীকে জানাতে হবে।

৬। পর্যটন স্হানসমূহে স্বাস্হবিধি রক্ষা করে আমোদ-প্রমোদে নিমগ্ন থাকতে হবে।

৭। অতিরিক্ত ভীড় এড়িয়ে চলতে হবে।

৮। সবসময় নিজের ও অন্যের সুরক্ষার প্রতি সতর্ক থাকতে হবে।

পরিশেষে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। না হয় সরকার আবার বন্ধ করলে এ শিল্পের সাথে যারা জীবন-জীবিকার বন্ধনে আবদ্ধ তারাই বেশি ক্ষতিগস্থ হবেন।

পর্যটকদের মনে রাখতে হবে, স্বাস্হবিধি মেনে চললে আপনি এবং আপনার পরিবার সুরক্ষিত থাকবে,সুরক্ষিত থাকবে আপনার পাশের বন্ধু।

” সতর্কতার মার নেই, তাই সতর্ক থাকি। “

আসুন” ,বিনোদনকে মধুর করে তুলতে সতর্ক থাকি,স্বাস্হবিধি মেনে চলি “
আল্লাহ আমাদেরকে করোনামুক্ত রাখুন।