‘পাটখাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বহুমুখী পাটপণ্যের বর্তমান বাজার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পুন:বিন্যাস করে বিজেএমসি’র বন্ধ ঘোষিত মিলসমূহ জরুরী ভিত্তিতে পুন:চালু করতে কাজ করছে সরকার । অবসায়নের পরে দেশের পাটকলগুলো তথা মিলগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ জিটুজি বা লিজ মডেলে পরিচালনার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা হবে।

আজ দুপুরে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)’র সম্মেলন কক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকলসমূহে বিরাজমান পরিস্হিতির স্হায়ী সমাধান এবং পাটখাতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রসংগে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম,এনডিসি। এসময় বিজেএমসি’র সচিব এ, এফ, এম, এহতেশামূল হক উপস্থিত ছিলেন।

এ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারের এ সিদ্ধান্তকে শ্রমিকদের অধিকাংশ এবং সুধী সমাজের পক্ষ হতে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। তৎসত্ত্বেও কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল অসত্য তথ্য প্রচার ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টির প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন থামানো কিংবা আন্দোলনের অংশ হিসাবে শ্রমিকদের গেট মিটিং পরিচালনা অর্থায়নের জন্য বিজেএমসি-র কোন বরাদ্দ নেই এবং এ খাতে কোন অর্থ ব্যয় করা হয়নি। অনুরূপভাবে সিবিএ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও বিজেএমসি এ পর্যন্ত কোন অর্থ ব্যয় করেনি।

শ্রমিকদের চাকুরী অবসান এবং পাটকলসমূহ বন্ধ ঘোষণার ক্ষেত্রে শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট সকল বিধান অনুসরণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের পাওনার পরিমাণ নির্ধারণ এবং তা পরিশোধের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রমিকদের চাকুরী ১ জুলাই, ২০২০ হতে অবসান করায় শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী ৬০ দিনের অর্থাৎ নোটিশ মেয়াদের মজুরী ব্যতিত ঐ তারিখের পর তাদের আর কোন দাবী বা পাওনা নেই। ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ হতে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা নোটিশ মেয়াদের অর্ধেক অর্থাৎ ৩০দিনের মজুরী পরিশোধ করা হয়েছে।

একই সাথে মিলগুলোকে উপযুক্ত ব্যবস্হায় আধুনিকায়ন ও পুনঃচালু এবং বিজেএমসি’র জনবল কাঠামো পরিবর্তিত পরিস্হিতির আলোকে যৌক্তিকীকরণের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ২টি কমিটি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, বেসরকারি খাতের প্রায় তিনগুণ মজুরীর কারণে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেশি হওয়ায় বাজারে টিকে থাকার জন্য বিজেএমসিকে হ্রাসকৃত দরে পণ্য বিক্রয় করতে হয়। এতে করে পাটখাতে সার্বিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্থ/বিনষ্ট হয় এবং বেসরকারি খাতের মিলগুলো উৎপাদিত পণ্যের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। এটি পাটখাতের সামগ্রিক ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নস্যাৎ করছে।

উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের প্রতিক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান বাজার ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশ হতে পাটপণ্য আমদানিতে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। এতে কেবল বিজেএমসিই নয়, বেসরকারি খাতের রপ্তানিকারকেরাও বিপাকে পড়েছে।

বর্তমানে পাটপণ্য উৎপাদনে বিজেএমসি’র অবদান মাত্র ৮.২১%, রপ্তানিতে এ হার আরও কম (৪.৪৫%)। প্রায় ৬০/৭০ বছর পূর্বের যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপিত এসব মিলের কার্যক্ষমতা সময়ের ব্যবধানে হ্রাস পেয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। তাছাড়া, বিজেএমসি’র পুরনো ব্যবস্থাপনা কাঠামোও অধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার উপযোগি নয়।

আর্থিক দুরাবস্হার কারণে চলতি ব্যয় মেটাতে সকলের পিএফ ও গ্র্যাচুইটি তহবিলের জমা ভেংগে ফেলা হয়েছে। অধিকন্তু, ২০১৪ সাল হতে অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৯ হাজার শ্রমিকের প্রাপ্য এবং বর্তমানে কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের মজুরির অংশ বিশেষও অর্থাভাবে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। পাট ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পরিসেবা ও ব্যাংক দেনা বাবদ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা দেনা দীর্ঘদিন অপরিশোধিত আছে।

এ পরিস্হিতিতে সার্বিক বিবেচনায় গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অবসায়নের মাধ্যমে মিলগুলোকে বর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার উপযোগিরূপে পুনর্বিন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপ চূড়ান্ত করেছে:

ক) ২০১৪ সাল হতে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের (৮,৯৫৪ জন) প্রাপ্য সকল বকেয়া, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের (২৪,৮৮৬ জন) প্রাপ্য বকেয়া মজুরী, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্র্যাচুইটি এবং সে সাথে গ্র্যাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ ভাগ হারে অবসায়ন সুবিধা একসাথে শতভাগ পরিশোধ করা হবে। এজন্য সরকারি বাজেট হতে প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা প্রদান করা হচ্ছে।

খ) অবসায়নের পর মিলগুলি সরকারি নিয়ন্ত্রণে পিপিপি/যৌথ উদ্যোগ/জি টু জি/লীজ মডেলে পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হবে।

গ) নতুন মডেলে পুন:চালুকৃত মিলে অবসায়নকৃত বর্তমান শ্রমিকেরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পাবে। একই সাথে এসব মিলে নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে।