বঙ্গবন্ধু, একটি প্রেরণার নাম

রায়হান ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক:

“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান”..

বঙ্গবন্ধু, একটি নাম। একটি ইতিহাস।একটি সংগ্রাম। একটি প্রেরণা।বাঙ্গালী জাতির এক অসংবেদি নেতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।যার সমস্ত জীবনটাই ছিল সংগ্রাম ও ত্যাগের মূর্তপ্রতীক।যার সংগ্রামী চেতনায় নির্যাতিত,পদদলিত ও নিরীহ পরাধীন এই বাঙ্গালী জাতি পেয়েছে মুক্তির দিশা।

যখনই শত্রুর অত্যাচার নির্যাতনের লেলিহান অগ্নিশিঁখা প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল বাংলার বুকে,সঙ্গে সঙ্গে সিংহের ন্যায় গর্জে উঠেছিল তার প্রতিবাদী হুঙ্কার। রাজপথ কম্পিত হয়েছিল তার আন্দোলন আর সংগ্রামে।তাই আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের মূর্তপ্রতীক হিসেবে বাঙ্গালীর হৃদয়ের মণিকোঠায় চির অমর হয়ে আছেন হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।কবি বলেছেন,

‘বিশ্বের একজন বাঙালি শ্রেষ্ঠ
শেখ মুজিবুর রহমান
পরাধীন বাংলাকে স্বাধীন করে
দিয়েছ সবার ওপরে স্থান’..

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের পদতলে ধীরে ধীরে অত্যাচার নির্যাতনে পিষ্ট হতে থাকে বাঙ্গালী জাতি।হরণ করে নেয়া হয় তাদের অধিকার।কেঁড়ে নেয়া হয় মুখের ভাষা।

কিন্তু বাঙ্গালী তা মেনে নিতে পরে নি।পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রকে নশ্বাৎ করতে হুঙ্কার দিয়ে রাজপথে বেড়িয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু।আজ বাংলার মানুষের দাবি একটাই। মায়ের ভাষাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কালো দাগ লাগতে দেয়া হবে না।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে রাজপথে আন্দোলনে ফেটে পড়ে বাংলার দামান ছেলেরা।আন্দোলন-সংগ্রামে আন্দোলিত হতে থাকে বাংলার রাজপথ।ফলে তাদের উপর নেমে আসে শাসকগোষ্ঠীর অসহ্য অত্যাচার-নির্যাতন।ভোগ করতে হয় জেল-জুলুম। কিন্তু বাঙ্গালী দমাবার পাত্র ছিল না।শত অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে নির্ভীক চিত্তে চালিয়েছিল সংগ্রাম। শুধু তাই নয়..

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী কণ্ঠস্বর ছিল সদা জাগ্রত।বঙ্গালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার নেতৃত্বে ছিল স্টেনগান আর বুলেটের সম্মুখ পানে।

১৯৬৬ সালের ৬-দফা,১৯৬৮ সালের গণঅভ্যুত্থান,১৯৭০ সালের নির্বাচনসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী কণ্ঠে ভেসে উঠেছিল বাঙ্গালীর অধিকারের কথা।তিনি পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দিয়েছিলেন মুক্তির ডাক।বাঙ্গালী জাতিকে দেখিয়েছিলেন অধিকার আদায়ের পথ।তার অমর কণ্ঠে ভেসে উঠেছিল সেদিন-
“এবারের সংগ্রাম,
আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
এবারের সংগ্রাম,
আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম…।”

সেদিন বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুন ধরা জ্বালাময়ী ভাষণে ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হয়েছিল বাঙ্গালী জাতি। অধিকার আদায়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস করেছিল বাংলার মানুষ।দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল পরাধীন এই বাঙ্গালী জাতি।ফলে সাত কোটি বাঙ্গালী পেয়েছিল একটি লাল সবুজের পতাকা।বিশ্বমানচিত্রে স্থান পেয়েছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাম। তাই তো আজ কবি কণ্ঠে ফুটে উঠেছে-

‘তুমি ইতিহাস, তুমি বাংলার ঐতিহ্য
তুমি বাংলার গৌরব, বাঙালির গর্ব
তোমার জন্য পেয়েছি আমরা
এই পৃথিবীতে বাংলা নামক স্বর্গ’..

সেদিন লাল সবুজের পতাকা হাতে বাঙ্গালী মুক্ত বিহঙ্গের মত ছুটে চলেছিল প্রিয় মাতৃভূমির বুকে।
স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস ফেলেছিল বাঙ্গালী মায়েরা।

বাঙ্গালী জাতির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ গঠনে।ফলে ভাগ্যের পরিবর্তন হতে থাকে বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের।এগিয়ে চলে দেশ।স্বপ্ন দেখে জাতি।

হঠাৎ বাংলার আকাশে নেমে আসে দুঃখের অমানিশা। ভোরের সোনালী সূর্যের গায়ে লাগে কলঙ্কের দাগ। বাংলার মাটি হয় রক্তে রঞ্জিত।একটি জ্বলন্ত প্রদীপ নিভে যায় ঘাতকের কালো থাবায়।

১৫ই আহস্ট ১৯৭৫ সাল।ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি। প্রভাতের আঁধ আঁধ আলো।নিস্তব্ধ শহর।ঘুমন্ত জাতির স্বপ্ন দ্রষ্টা।ঘাতকের হাতে স্টেনগান।হঠাৎ বিকট শব্দ। ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ।রক্তে রঞ্জিত ঘাতকের কালো হাত।স্বপ্নভঙ্গের পথে একটি জাতি।

“পৃথিবী নামক পুষ্পকাননে
তুমি ছিলে এক প্রস্ফুটিত ফুল
ঘাতকেরা তোমায় হত্যা করে
করেছিল এক চরম ভুল”..

বাংলার ইতিহাসে আজ সেই তারিখ।সেদিন ঘাতকের বুলেটের আঘাতে বৃষ্টিঝরা শ্রাবণের অন্তিম দিনে ঝরেছিল রক্ত।ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বুকে লেগেছিল কলঙ্কের দাগ।বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িতে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহখানি।হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি সোনার বাংলাদেশ গড়ার কারিগর বঙ্গালীর প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, সন্তান শেখ কামাল,শেখ জামাল এবং পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালকে।ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলকেও রক্ষা পায় নি ঘাতক হাত থেকে।পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারে নি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্তবাবু,বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি,তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন।সেদিন বাঙ্গালীর ইতিহাস তীর্থে হত্যা করা হয়েছিল কেবল তাঁর নশ্বর দেহখানি,কিন্তু তাঁর অবিনশ্বর চেতনা ও আদর্শ ছিল মৃত্যুঞ্জয়ী।ঘাতকের সাধ্য ছিল না ইতিহাসের সেই মহানায়কের অস্তিত্বকে বিনাশ করে।

“তুমি আছ বাঙালির অন্তরে
আছ প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে
মিশে আছ বাঙালির সত্তায়
থাকবে গৌরবে-গর্বে-বিশ্বাসে”…

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা হত্যা করতে চেয়েছিল বাংলাদেশকে।মুছে দিতে চেয়েছিল ৩০ লক্ষ শহীদের ত্যাগ।ধ্বংস করতে চেয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র হতে লাল সবুজের পতাকা।কিন্তু তাদের জানা ছিল না। এই বিজয় শুধু বিজয় ছিল না।ছিল ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীর ত্যাগের মূর্তপ্রতীক।ছিল ৩ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের ঋণ।যাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় মিশে গেছে বাংলাদেশের নাম।মিশে গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম।যেটা শত যুদ্ধ করে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

“মরেও অমর তুমি ধরণির বুকে
তোমার কীর্তি রবে সবার মুখে মুখে
তুমি ছিলে তুমি আছ তুমি থাকবে”..

আজ সেই অন্তিম শোকার্দ্র বাণী পাঠের দিন।আজ সেই রক্তঝঁরা ১৫ আগস্ট।বেদনাবিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কলুষিত বিভীষিকাময় ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর দিন।আজ সেই মহাপুরুষ স্বাধীন বাংলার স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী। বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির জন্য এক গভীর মর্মস্পর্শী শোকের দিন।জাতীয় শোক দিবস। কলঙ্কমুক্ত বাঙালী জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে স্মরণ করবে। জাতি আজ শপথ নিবে বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত সেই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ার।

দুরন্ত/১৪আগস্ট/ডিপি/এসপি