বন্ধ হউক ম্যারিটাল রেইপ। নিপাত যাক ধর্ষণ সংস্কৃতির।।

জিন্নাতুন নেছা:

ঘটনা -১ঃ

১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিলো রেবার। স্বামীর বয়স ছিলো ২৫ বছর। রেবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সবে ভর্তি হয়েছে নামী একটা বিভাগে।রেবার স্বামী (রিফাত) ও স্টুডেন্ট।প্রেমের বিয়ে আর কি! বিয়ের প্রথম কয়েকদিন তো রেবাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ায় বন্ধ করে দিয়েছিলো।উল্লেখ্য রেবা এবং তার স্বামী ঢাকায় একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। রেবা বলতো কেন আমি ক্যাম্পাসে যাবোনা? আমার ক্লাস মিস হবে তো? উপস্থিতির নাম্বার পাবোনা।না,আমি ক্লাসে যাবোই।রিফাত বলতো,আরে বোকা! নতুন বিয়ে করলে ঘর থেকে বের হতে নেই।রেবা,কেন কেন?? এ আবার কেমন কথা! তাহলে কি নতুন বিয়ে করলে সব কাজকর্ম বাদ দিতে হয়! রিফাত বলতো,হয় বৈকি! অন্তত দুই-চার মাস তো হয়ই।সারাদিন শুধু আদর আর আদর।শব্দটা এতো মধুর শুনালে ও প্রতিদিন যদি ৩-৪ বার সেক্স যা কিনা বিয়ে করলেই স্বামী প্রভুধন চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবেন এর মত অবস্থা সেটা একটা নারীর জন্য কখনোই সুখকর নয়,কিংবা থাকেনা,থাকতে পারেনা।রেবা ধীরে ধীরে অনুভব করতে থাকলো তার নিকট স্বামী- স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক যেনো আর আদরে থাকছেনা।অর্থাৎ ভালো যাচ্ছেনা।অবশেষে রেবার স্বামী অভিযোগ করা শুরু করলো আচ্ছা,তুমি তো কখনো নিজ থেকে আমাকে আদর করতে চাওনা? রেবা নির্বিকার ভাবতে থাকে।আচ্ছা সারাদিন ক্লাস,টিউশন, ঘরের কাজ এরপর ও যদি কোন স্বামী দিনে দুইবার সেক্স করতে চায় তাহলে এমন কোন নারী কি আছেন যে আবার নিজের একান্ত লালিত মনের বাসনা তার কাছে প্রকাশ করবে কিংবা আদৌ আর কোন মনের বাসনা থাকবে!!

ঘটনা -২ঃ

লিলিথ বিয়ে হয়েছিলো অষ্টম শ্রেনী পড়ুয়া অবস্থায়।স্বামী একটা সরকারি কেরানী পোস্টে চাকুরি করে।বয়স ছিলো ২৫-৩০ বছর।নামঃ কাব্য।বিয়ে করার পরই লিলিথকে নিয়ে কাব্য পাড়ি জমায় ঢাকা শহরে।ভালোই চলছিলো তাদের সুখের সংসার।অন্তত লোকজন বাহির থেকে তাই ভাবতো।একদিন লিলিথ এর বাসায় ঘুরতে গিয়েছিলাম।কথায় কথায় লিলিথ জড়িয়ে ধরে সেই কি কান্না! কারণ জানতে চাইলে লিলিথ জানালো আর পারছিনা দিদি,কাব্য প্রতিদিন নেশা করে ফিরে হায়েনার থাবার মত আমার শরীরটাকে ব্যবহার করে।এই যে দিদি দেখো দেখো কত কালশিটে দাগ আমার শরীরে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলাম! নির্বিকার তাকিয়ে ছিলাম! কাব্য এতো নিচে নেমে গেছে! লিলিথ বলেই চলেছে,দিদি এগুলো ক্ষমতার প্রদর্শন। আমার উপর হায়েনাটা(কাব্য) যখন ঝাপিয়ে পড়ে তখন বলে,”তোদের(মেয়েদের) এভাবেই জব্দ করে রাখতে হয় বুঝলি,নইলে পাখনা গজবে,উড়তে শিখবি!”
জন্মের কান্না লিলিথ সেদিন কেদেছিলো শুধু বলেছিলাম কাদো লিলিথ কাদো। অন্তত হালকা হবি।আর কিছু বলতে পারিনি।অনেকটা চোরের মত পালিয়ে আসতে হয়েছিলো সেদিন।

ঘটনা-৩ঃ
শেফালী( ১৩ বছর) গ্রামের মেয়ে।পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি তেমন।স্বাক্ষর করতে পারে আর কি?বাবা বিয়ে দিয়েছিলো ৩৫ বছরের বউ মারা যাওয়া জাকিরের(গ্রামের মাত্তবর)সাথে।বিয়ের প্রথম দিন জাকিরের সাথেই একঘরে ছিলো শেফালী। বাসর রাত বলে কথা! কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে আর জাকিরের সাথে ঘুমাবে না শেফালী সেই কি কান্না! শুধু বলছে আমাকে আমার বাবার বাড়িতে রেখে আসো।কিন্তু কে শোনে কার কথা! এভাবে এক সপ্তাহ পার হয়ে যায়।অবশেষে শেফালীর বাবা এসে তাকে নিয়ে যায়।দুই দিন পর জাকির তার শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছে কিন্তু শেফালী কেবলই পালিয়ে বেড়ায়।নানী,দাদি,চাচি,বোন কেউ-ই শেফালী কে প্রশ্ন করে কোন সদুত্তর পায়না।অবশেষে প্রায় ২০ দিন অতিবাহিত হবার পর শেফালীর খুব কাছের ভাবি উদঘাটন করে শেফালীর যোনিপথ ফেটে গিয়েছে।ঘা হয়ে গিয়েছে।যা শেফালী লজ্জায় কাউকে বলতে পারছেনা।কারণ হলো ৩৫ বছর বয়সী স্বামী জাকির তার স্বামীত্বের বৈধতা নিয়ে দিনে কখনো ৪ বার কখনো ৫ বার ও শারীরিক সম্পর্ক লিপ্ত হয়েছিলো শেফালীর সাথে।যেনো শেফালী তার রেজিস্ট্রি করা কেনা গোলাম।

ঘটনা – ৪ঃ

নাম লিনা।বয়সঃ ২৫.বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি সবে পেরিয়েছে।লিনা একটা নামী এনজিও তে জব করে।স্বামী ও একটা নামী সরকারি চাকুরে।কাজের সুবাদেই লিনার সাথে আমার পরিচয়।কয়েকদিন থেকেই লক্ষ্য করছিলাম লিনা খুব আনমনা, উদাসিন।কাজে তেমন মন নাই।লিনাকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে তোমার?? প্রথম কয়েকদিন এড়িয়ে গেলো।বলতে চাইলোনা।ব্যক্তিগত ব্যাপার ভেবে আর আগ্রহ দেখাইনি।এর কয়েকদিন পর অনেকটা কাদো কাদো গলায় লিনা জানালো আপা কি করবো বলেন তো? বললাম কি সমস্যা আগে সেটা তো বলো? লিনা কাদো কাদো গলায় বলতে শুরু করলো আপা আর পারছিনা।সারাদিন অফিস,সন্তান লালন পালন,ঘরের কাজ করে কি প্রতিদিন শোবার সময় একবার কোন কোন দিন ভোরবেলাতে ও শারীরিক সম্পর্ক করতে ইচ্ছে করে বলেনতো!! খুব নির্বিকার লিনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম আচ্ছা,পুরুষদের কি লিংগের ডগায় পানি লেগেই থাকে! লিনাকে বললাম তুমি এতে সম্মতি দাও কেন? জোর করে তো আর করতে পারবেনা! লিনা জানায়,আপা অনেক সময় অসম্মতি জানায়,সাফ জানিয়ে দেই পারবোনা।কিন্তু কি বলে জানেন,”তোকে কেন বিয়ে করেছি? যদি দিতে না পারোস অন্য মেয়ের কাছে যাবো।”কি করবো আপা,সংসার তো বাচাতেই হবে।।

উপরিউক্ত চারটি ঘটনায় সত্য।আমার বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো গবেষণার ফলাফল। ঘটনায় ব্যবহৃত সকল নাম ছদ্মনাম।

এই চারটি ঘটনা কেবল চারটিই নয়।বরং আমাদের বাংলার প্রতিটি ঘরের প্রতিচ্ছবি এই ঘটনাগুলো যা শ্রেনী,ধর্ম,বর্ণভেদে। যা বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবেনা।

ঘটনাগুলোকে যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে একে এক বাক্যে বলা যায় ম্যারিটাল রেইপ।আমাদের সমাজে মা,খালা,চাচি কিংবা অনেক নারীরাও জানেনা ম্যারিটাল রেইপ বলে একটা টার্ম আছে।যা হলো বিয়ের পর ও যদি আপনার স্বামী তার স্ত্রীর সম্মতি না নিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় তবে তাকে ম্যারিটাল রেইপ বলে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো বেশিরভাগ নারী তা শিক্ষিত থেকে নিরক্ষর সকলের মধ্যেই একধরনের ধারণা আছে বিয়ের পর স্বামীর সাথে যদি না শোয় তাহলে সে অন্য নারীর কাছে যাবে, পরকীয়ায় লিপ্ত হবে।কিন্তু এটা ভ্রান্ত ধারণা।জাস্ট ভিত্তিহীন।যে স্বামী আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার সময় আপনাকে সম্মান দেয়না,আপনার মতামতের গুরুত্ব দেয়না,আপনার ভালো লাগা,মন্দলাগার গুরুত্ব দেয় না।সেই স্বামী আর ১০ জনের সাথে শোয়না,পতিতালয়ে যায় না এই গ্যারান্টি আপনি দিতে পারবেন?? পারবেন না!

সেক্স একজন নারী বা পুরুষের অধিকার।তবে তা জোরপূর্বক আদায় করা নয়।তাহলে তা ধর্ষণের শামিল।দুই পাতার রেজিষ্ট্রেশন আর তিনবার কবুল পড়লেই একজন নারী আপনি পুরুষ আপনার প্রোপার্টি হয়ে যায় না! হতে পারে না! এসময় দাদি,নানিদের বলতে শুনতাম,”আরে মাইয়া শোন বিয়ার পর স্বামী যদি তোর লগে থাকতে চায় তোরে দিতে হইবো না দিলে পাপ হইবো।” আদৌ ইসলাম ধর্মে আছে নাকি আমি জানিনা।আদৌ পাপ হবে কিনা আমি জানিনা।কিন্তু আমার শরীর পারমিট না করলে,আমার রোমান্স ফিল না হলে আমি ভাই তুমি স্বামী হও আর যাই হও তোমার সাথে সেক্স করতে নারাজ।জাস্ট পারমুনা।প্রতিটি পুরুষের ইসলামের দোহায় দিয়ে বিয়ে করলেই স্বামী বউকে যখন যে অবস্থায় চাইবে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে হবে এই ফালতু ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।এইটা ম্যারিটাল রেইপ করার একটা মোক্ষম হাতিয়ার।অন্যদিকে ভালোবাসায় গদগদ হয়ে স্বামীকে বলতে শোনা যায় “তুমি ঠিকমত খাচ্ছোনা কেন? কেমন যেনো শুকিয়ে যাচ্ছো? শোন তোমার শরীর কিন্তু এখন তোমার নাই এগুলো আমার সম্পদ।” যেনো হৈমন্তী গল্পের নায়ক বনে গেছে।আরে ভাই জন্মানোর সময় সৃষ্টিকর্তা নাক,মুখ,দুই চোখ,হাত,পা,একটা দেহ দিয়ে পাঠিয়েছেন।বাবা- মা একে তিলে তিলে যত্ন করে বড় করেছেন।আর আপনি দুই দিনের কোন আবাল তিনবার কবুল পড়েই নারীর শরীর কিনে ফেলেছেন।কি মজার ব্যাপার তাই না!!

আসলে এই বিষয়ে নারী সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরী। স্বামী ও যে স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত সেক্স করলে তা ধর্ষণ হয় তা নিয়ে বিস্তর কাজ করার সুযোগ আছে।কারণ আমার ধারণা প্রায় ৮০% এর উপর নারী এই বিষয়ে অবগত না।তারা জানেন না স্বামীর দ্বারা বউ ধর্ষণের শিকার হয়।৮০% বললাম এই কারনে আমাদের গাও গেরামের মা-বোনেরা তো জানেনই না।আর আমার মনে হয় শহুরে নারীরাও এটা নিয়ে তেমন ওয়াকিবহাল না।

তাই সচেতনতা বাড়ানো উচিত।বিয়ে নামক সামাজিক চুক্তির অন্তরালে আর কোন ধর্ষণ হউক তা আর হতে দেয়া যেতে পারেনা।তাই বন্ধ হউক স্বামী দ্বারা স্ত্রী ধর্ষণ অনেকটা হেজেমনিক কায়দায়।রেজিষ্ট্রেশনের দোহায় দিয়ে।

দুরন্ত/৫নভেম্বর/পিডি