“মানবিক মূল্যবোধ কল্যাণ রাষ্ট্রের নিয়ামক”

অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম:

মানুষকে মানুষ বলা হয় কারণ তারমধ্যে মানবিকতা আছ,বিবেকবোধ আছে,হিতাহিত ঞ্জান আছে, ভালমন্দ যাচাই করার সক্ষমতা আছে, যা ভিন্ন কোন প্রাণী বা জীবের মধ্যে নাই।

মন মানবিকতা হারিয়ে ফেললে তা সমাজের সুখকে কেড়ে নেয়। মানুষের হ্রদয় বলতে কিছু থাকে না, হয় পাষাণ হ্রদয়।

সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে কিছু মানবিক বিকারগস্ত লোক।যুব সমাজের একটি চক্র তাদের মানবিকতা হারিয়ে সমাজে দাপড়িয়ে বেড়ায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। বাছ বিচার ছাড়া অন্যায়কে ন্যায়য়ে পরিণত করে।ধুমপান থেকে শুরু করে মাদক গ্রহণ তাদের কাছে কিছুই মনে হয় না। যা সমাজে বয়ে আনে অশান্তি। আর এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।সামাজিক ভাবে বয়কট করে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকলে সমাজ ব্যবস্হা ভেঙে পড়বে।তাই আসুন আমরা সমাজের অন্যায়,অত্যাচার ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে সদাশয় সরকারকে সহযোগিতা করি।

★★ আজ মানবিকতা পদে পদে লাঞ্ছিত। সকল পর্যায়ে মানবিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানবিকতা হারিয়ে আজ যুব সমাজ হিতাহিত ঞ্জানশূন্য হয়ে নিজের সহপাঠীকে করছে হত্যা।যে ছাত্র সমাজের হাতে থাকার কথা কলম- বই। সে ছাত্র সমাজের কিছু অংশ পথভ্রষ্ট হয়ে তুলে নিয়েছে নির্মমভাবে হত্যার হাতিয়ার। তারা শিক্ষিত হয়েও মানবিকতা হারিয়ে পশুর পর্যায়ে নেমে এসেছে। এজন্যই মাননীয় শিক্ষামণ্ত্রী মহোদয় প্রায়শই বলে থাকেন,” ভাল ফলাফলের আগে ভাল মানুষ হতে হবে”। কলম যতই দামী হউক, কালি না থাকলে যেমন তার কোন মূল্য নেই। তেমনি মানুষ যতই উচ্চ শিক্ষিত হউক, মানবিকতা না থাকলে তাকে মানুষ বলা যায় না। তাই শিক্ষার সাথে সাথে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ আবার মাদকের মতে ভয়ংকর নেশায়ও জড়িয়ে পড়ে। এতে সমাজে দেখা দেয় অস্হিরতা। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা এর ছোবল থেকে রক্ষা পেতে পারে।
আজকের শিক্ষার্থী, আগামী দিনের কর্ণধার। তারাই সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে।বড় বড় শিল্প কারখানা, ব্যবসা- বাণিজ্য করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে।আমলা হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসনের ব্যবস্হা করবে।ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, শিক্ষক হয়ে দেশের জনগণের সেবা করবে।রাজনীতিবিদ হয়ে কল্যাণ রাষ্ট্রের ভীত রচনা করবে।আর সেই যুব সমাজ যদি মাদক,অস্ত্র ও সন্ত্রাসের হাতেখড়ি নিয়ে বড় হতে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে মানবিকতার চর্চা আশা করা দূরহ।

ভঙ্গুর চরিত্রের মানুষ দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তাইতো দেখা যায় সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দূর্নীতিবাজদের পদচারনা। তারা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে সমাজকে করেছে কলুষিত। সরকার একার পক্ষে দূর্নীতিরোধ সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।শিক্ষা ব্যবস্হায় নৈতিকতা ও মানবিকতা পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক।

দেশে দেশে আজ মানবিকতা ভূলুণ্ঠিত। মানবিকতার তৃষ্ণায় বিশ্ব বিবেক পিপাসার্ত।মানবিকতার স্লোগান দিয়েও বড়ত্ব ও ক্ষমতার আবরণে করে অমানবিক আচরণ। বিশ্ব তাই অমানবিকতার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা সর্বক্ষেত্রে মানবিক হয়ে উঠি। আমরা দেখতে পাই….

★ অভিবাসীদের করুণ অবস্হাঃ- আজ সারাবিশ্বে মানুষ বিভিন্ন কারণে অভিবাসিত হচ্ছে। তারা তাদের জীবন ধারণের নূন্যতম অধিকারও পাচ্ছে না,মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাবুতে বসবাস করে,খাদ্য,পানীয়, বশ্র ও সুচিকিৎসার কোনো বালাই নেই।এদের জীবন ধারণের নূন্যতম সুব্যবস্হা করা দরকার।

★ মিয়ানমার পরিস্থিতিঃ- রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাখাইন এলাকার মুসলমানদেরকে নানাবিধ অত্যাচার ও হত্যার মাধ্যমে দেশ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা ঐ এলাকায় বসবাস করে আসছে। আর পরিকল্পিতভাবে তাদেরকে নির্বাসিত করা হয়।এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জোয়ারের মতো বাংলাদেশে আসতে থাকে।
এক্ষেত্রে ” মানবতার মা” বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় প্রদান করে।কিন্তু চিরদিন এ আশ্রয় দেয়া কি সম্ভব? তাছাড়া তাদেরতো অধিকারের প্রশ্নও এখানে জড়িত।আশাকরি মায়ানমার সরকার এবিষয়ে যথাযথ ব্যবস্হা গ্রহণ করবেন।

★ মানবপাচারঃ- অনেকেই ভিন দেশে চাকুরির আশায় দালালদের খপ্পরে পড়ে পাচারিত হয়। এতে তাদের অনেকেরই মনের আশা পূর্ণ হয় না।উপরন্তু কারো কারো জীবন নাশের সম্মুখীন হতে হয়।মানব পাচারকারীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে নিয়ে পরবর্তীতে তাদেরকে অমানবিক পন্থায় এক দেশ থেকে অন্যদেশে নিয়ে অন্য দালালের হাতে তুলে দেয়। ঐ দালালরা আবার বাড়তি টাকার জন্য চাপ তথা অত্যাচার চালাতে শুরু করে। এতে অনেকের প্রাণনাশের মতো ঘটনাও ঘটে।সরকার বারবার অবৈধ পন্থায় দালালের মাধ্যমে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করার পরও মানুষ সচেতন হচ্ছে না।আশাকরি সকলে বৈধভাবে বিদেশে যাই,অবৈধ পন্হা পরিহার করি।নিজের প্রাণ বাঁচাই, পরিবার- পরিজনকে রক্ষা করি।

★ দেশে দেশে মানবিকতার সংকটঃ- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিগত হানাহানি, যুদ্ধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ধর্মের নামে মনুষ্যত্ব বর্জন যা মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে বিকলাঙ্গ করে ফেলেছে।যেমন,সিরিয়া,ফিলিস্তিন ও আফগান সংকটে বিশ্ব মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত।
তাই আসুন মানুষকে মানবাধিকার দৃষ্টিতে মূল্যায়ণ করি।।

★ বিভিন্ন রুপে মানবিকতার লংঘনঃ- ধর্মের নামে অধর্ম,শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, পারিবারিক কলহ,প্রেমের নামে পরকিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত।

★ অবৈধ কাজকে সর্বত্র বৈধঃ- সুযোগ সন্ধানী, অন্যায়কারী, সকল অবৈধ কাজকে বৈধতার মোড়কে আবৃত করে সমাজকে করে কলুষিত, তাদের চেহারা জন সম্মুখে প্রকাশ করে সমাজকে কলুষমুক্ত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আশাকরি, অবৈধ অর্থ উপার্জনকারী,লোভী, মনুষ্যত্বহীন ব্যক্তিদেরকে শাস্তির আওতায় এনে প্রকৃত বিচার করলে, এরা আর সমাজকে কলুষিত করতে পারবে না।

মানুষে মানুষে সম্পর্কের ২ টি দিক আছে….
আত্মিক ও আর্থিক।
আধুনিক বাংলাদেশে আর্থিক বিষয়টি প্রবল হয়ে উঠছে,
আর আত্মিক সম্পর্কটা পেছনে পড়ে গেছে।
মনে হয় অর্থ —- স্বার্থ ও বিত্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে।
সমাজের সর্বত্র ক্ষমতা, অর্থ ও অস্ত্রের যে দানবীয় রুপ দেখছি,তাতে মানবিকতা আশা করা যায় না।
ধন্যবাদ সকলকে।

লেখকঃশিক্ষাবিদ ও গবেষক।