রাজনীতিকদের বেপরোয়া পুত্ররা

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ:

এখন চলছে ইরফানপর্ব। ফেইসবুকে, পত্রিকার পাতায়, টিভিতে, চায়ের স্টলে কোথায় নেই ইরফান? নৌবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনের দাঁত ফেলে দিয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাওয়া ইরফান এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ঢাকার আলোচিত নেতা হাজী সেলিম এমপির পুত্র।

ইরফান সেলিমকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশ রমরমা ভাব।

রাজধানীর কলাবাগান ক্রসিংয়ের কাছে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহম্মেদ খানকে বেধড়ক মারধর করেন হাজী সেলিমের ছেলে ও তার সঙ্গী-দেহরক্ষীরা। এ সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তার স্ত্রীও ছিলেন। তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়। সে ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমরা জানতে পারছি, আলিশান বাড়িতে থাকতেন ইরফান। যেন এক রাজপ্রাসাদ। সেই বাড়িকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ইরফান সেলিমের অপরাধ জগৎ। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো পুরান ঢাকা। চলত চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী। আর এজন্য গড়ে তোলা হয় শক্তিশালী এক ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক।

র‌্যাবের অভিযানে তার বাসায় মেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, মদের বোতল, বিয়ার, ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ও হ্যান্ডকাফ। সেখানে বিপুল পরিমাণ কালো রঙের ওয়াকিটকিও পাওয়া যায় যা বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া আর কেউ ব্যবহার করতে পারেন না। এ ছাড়া বেডরুম থেকে উদ্ধার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। একটি গুলিসহ পিস্তল, আরেকটি বন্দুক। এগুলোর লাইসেন্স নেই। উদ্ধার করা হয় শক্তিশালী অবৈধ ড্রোন, যেটা আমদানি করতে সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগে। ইরফান সেলিমের দেহরক্ষী জাহিদের কাছে ৪০০ পিস ইয়াবা ও বিদেশি অস্ত্র পাওয়া যায়। ওই বাড়ির পাশে ইরফান সেলিমের একটি টর্চার সেলের সন্ধান মেলে। সেখানে তার প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নির্যাতন করা হতো। তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। সেখানেও মেলে হাতকড়া। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ অক্টোবর ২০২০) শুধু হাজী সেলিমপুত্র ইরফানই নয়, এর আগেও আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার পুত্ররা।
২০১৬ সালের ২৮ জুন দৈনিক কালের কণ্ঠের সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল, ‘তিন ইয়াবা কারখানার মালিক রনি চৌধুরী’। রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ছেলে তিনি, নাম রনি চৌধুরী। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আন্ডারওয়ার্ল্ড। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কায়েম করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। মাদক কারবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। ইয়াবা বানানোর অন্তত তিনটি কারখানা আছে তার। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে সরকারি সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছে রনি ও তার গ্রুপের সদস্যরা। র‌্যাব ও পুলিশ দিয়ে আটকের ভয় দেখিয়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রনি চৌধুরীর বড় ভাই দিপু চৌধুরী নিয়ন্ত্রণ করতেন রাজধানীর অপরাধ জগৎ। এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন রনি। সে সময় রনির বড় ভাই দিপু চৌধুরী পুরো উত্তরা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার দখলে ছিল উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব। ওই ক্লাবের আধিপত্য নিয়ে ১৯৯৭ সালের দিকে তিতাস নামে একজনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দিপু চৌধুরীসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে মামলা আছে।

রিপোর্টে নাম উল্লেখ না করলেও অনেকেই হয়তো জানেন, এই দিপু, রনি আওয়ামী লীগের এককালের প্রভাবশালী নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে, যিনি নিজ সরকারের আমলেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দুর্নীতির জন্য দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। পরে কী এক জাদুর স্পর্শে জেলে যাওয়া থেকে বেঁচে যান তিনি। তার জামাতা তারেক সাঈদ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারের আসামি হয়ে বর্তমানে জেলে।

লক্ষ্মীপুরের আলোচিত-সমালোচিত আওয়ামী লীগ নেতা তাহেরের পুত্র এইচ এম বিপ্লবের কথাও হয়তো অনেকের মনে আছে। পিতা-পুত্রের সন্ত্রাস ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল সারা দেশ। ফাঁসির দন্ড ও হয়েছিল বিপ্লবের। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতির ‘বিশেষ ক্ষমায়’ একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ড থেকে রেহাই ও দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা আংশিক মওকুফ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে একটি হত্যা মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারসহ বহুবিধ সুবিধা পেয়ে সে এখন মুক্ত।

২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে নিউ ইস্কাটনে গাড়ি থেকে বিনা কারণে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে এক যুবক হত্যা করেন রিকশাচালক হাকিম ও অটোরিকশা চালক ইয়াকবুব আলীকে। সে যুবক হলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের এমপি বেগম পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। পরে জানা যায়, রনি মাতাল ছিলেন। তার গাড়ির সামনে যানজট দেখে বিরক্ত হয়ে যানজট দূর করতে নাকি তিনি গুলি চালিয়েছিলেন।

ময়মনসিংহের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা আলতাফ গোলন্দাজ (প্রয়াত) ছিলেন ব্যাপক পরিচিত এক নাম। গোলন্দাজ বাহিনী বললেই সবাই জেনে যেত কার কথা বলা হচ্ছে। পিতার মৃত্যুর পরে তার ছেলে ফাহমি গোলন্দাজ বর্তমানে এমপি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, বাবার যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি ধরে রেখেছেন সে সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য। তাকে নিয়ে প্রথম আলোতে লেখা হয় (২২ নভেম্বর ২০১৮), এক ভীতসন্ত্রস্ত ও নিপীড়িত জনপদ গফরগাঁও। সাংসদের নির্যাতনে বিরোধীদলীয় হাজারো নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। শুধু বিরোধী দল নয়, সাংসদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এমন কয়েক শ পরিবার গফরগাঁও ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এই ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছেন, কিন্তু প্রতিকার পাননি।

সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত এই সব সন্তানদের পিতারাও কোনো না কোনো সময় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অভিযুক্ত হয়েছেন। আসলে এই সব সন্তানরা শুধু তাদের বাপের না, পাপেরও উত্তরাধিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতা ও তাদের সন্তানদের বিষয়গুলো এখন অধিক আলোচনায় থাকায় সেগুলো তুলে ধরলেও বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের নেতা ও তাদের পুত্ররা যে এমন অভিযোগের বাইরে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আসলে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটার কাঠামো এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে এখানে ক্ষমতাবানরা যা খুশি করে পার পেয়ে যেতে পারে। হোক সে অর্থের ক্ষমতা, রাজনীতির ক্ষমতা বা প্রশাসনিক ক্ষমতা। ক্ষমতা দিয়ে প্রায় সব কিছুৃ ম্যানেজ করার মন্ত্র এই দেশে বেশ কার্যকর। শুধুমাত্র বেজায়গায় হাত পড়লে বা সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন তুলে বিষয়টি সরকারের জন্য বেশি স্পর্শকাতর হয়ে পড়লে তখন সাময়িক বিপদে পড়েন এই ক্ষমতাধররা।

লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

sayantha15@gmail.com