রাবির ‘ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতন’ দিবস আজ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

১৩ বছর আগের ঘটনা।২০০৭ সালের এই দিনে তত্বাবধায়ক সরকারের আদেশে আইনশৃংখলা বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র শিক্ষকের উপর চালিয়েছিল চরম অত্যাচার-নির্যাতন। গ্রেফতার করা হয়েছিল কর্মকর্তা, শিক্ষক ও ছাত্রদের।

এই ঘটনা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় দিবসটি পালনে কোনো কর্মসূচী নেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিবস উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠিত। এবারের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অত্যাচার-নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতা যে দীর্ঘায়িত করা যায় না তার একটা উদাহরণ হয়ে আছে এই দিবস।’

কী ঘটেছিল সেদিন?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালে ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের সংঘর্ষ বাধে।এসময় অনেক ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।তারই প্রেক্ষিতে
২১ শে আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল বের করেন। পরদিন ২৩ তারিখে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন উস্কানির পরিপ্রেক্ষিতে সহিংস ঘটনা ঘটে।তখন ডিজিএফআইয়ের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।ওই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৮ শিক্ষক, এক কর্মকর্তা ও ১০ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়।এসব ঘটনায় কোনো ছাত্র-শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা কখনই কোনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।ধারণা করা হয় আন্দোলনরত ছাত্র-শিক্ষকদের দমাতে কৌশলগত কারণে সহিংসতা ছড়ানো হয়েছিল।কারণ, আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ।’

কিসের প্রেক্ষিতে ঘটেছিল?

‘তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানাভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে কর্মপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।সেনা সমর্থিত এই সরকার ক্ষমতা শক্তিশালী করতে দলীয় নেতাদেও জেলে পাঠাতে পিছপা হননি।আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার সে প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল। সেজন্য প্রতিবাদ প্রয়োজনীয় ছিল।কিন্তু, জরুরি অবস্থা জারি থাকায় সভা ও মিছিল মিটিং বন্ধ ছিল। কিন্তু অতীতের সব আন্দোলন সংগ্রামের মূর্তপ্রতীক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও সচেষ্ট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন কোনো আন্দোলন সৃষ্টি না হয়।এর মধ্যে শিক্ষকরা গণছুটি নেওয়ায় নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ।’

তৎকালীন সময়ে গ্রেফতার হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকার মলয় ভৌমিক বলেন,

২৩ শে আগস্ট আমার ঘোড়ামারার বাড়িতে রেইড দেওয়া হয়।কিন্তু, আমি অসুস্থার কারণে বেশ কয়েকদিন ধরে ক্যাম্পাসেই বোনের বাসায় ছিলাম। কারণ আমার স্ত্রী ও মেয়ে ঢাকায় ছিল, আমাকে দেখার কেউ ছিল না।’

‘আমাকে খোঁজাখুজি করেছে।তারা জেনেছে আমার বাড়িওয়ালাকে আমি আমার অবস্থান জানিয়ে রাখি।২৪ আগস্ট বিকেলে আমার বোনের বাসা ঘিরে ফেলে।বেশ কয়েক ঘণ্টা পর আমাকে একটি গাড়িতে করে সাধারণ মানুষের মতোই ক্যাম্পাসের বাইরে তৎকালীন শ্যামপুরস্থ র‌্যাবের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। চোখ কালো কাপড় বেঁধে নেয়া হয়েছিল।

এদিকে ২৪ আগস্ট রাত ১টায় রাবির প্রগতিশীল শিক্ষকদের আহবায়ক অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বাসা ঘিরে ফেলে সেনা নেতৃত্বের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভোররাত ৩টায় তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই আবাসিক এলাকা বিহাস থেকে অধ্যাপক সাইদুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

পরদিন শ্যামপুর র্যাব কার্যালয়ে আমাদের অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়।সেখানে আমাকে ইলেকট্রিক শক পর্যন্ত দিয়েছে।’

‘পরদিন সন্ধ্যায় আমাদের তিন জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।রাতে আদালত বসানো হয়। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তিনটি: এক গণছুটি নেওয়া, মৌন মিছিল করা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া। আমাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন নুরুল ইসলাম সরকার আসলাম। তার কথা যথাযথভাবে না শুনেই আদালত আমাদের বিরুদ্ধে ১০ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করে।’

‘একই মামলায় অভিযুক্ত করা হয় সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের আরও তিন শিক্ষককে। তারা হলেন দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, সেলিম রেজা নিউটন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন।তারা পরে আত্মসমর্পণ করেন।’

‘পরবর্তীতে আরও একটি পৃথক মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান সজল ও গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাদিকুল ইসলাম ও ১০ ছাত্রকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ডিজিএফআইয়ের গাড়ি পোড়ানো। তারাও আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।’

‘আদালত থেকেই আমাদেরকে মতিহার থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন দিন রেখে ঢাকায় কচুক্ষেত ক্যান্টনমেন্টের টাস্কফোর্স ইনটারোগেশন সেলে নেওয়া হয়। অভুক্ত রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। দুদিন পর রাজশাহীতে আনা হয়। অন্য সব শিক্ষককেও সেখানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।’

‘আমাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ছাত্র-শিক্ষকের পাশাপাশি সাধারণ জনতাও বিক্ষুব্ধ হন। কিন্তু, তড়িঘড়ি করে আমাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে বিচার কার্য শুরু করে। বিচারে সাইদুর রহমান ও আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের মুক্তি দেন।’ কিন্তু দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, সেলিম রেজা নিউটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আমাকে মিছিল করার অভিযোগে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।’

এদিকে জনগণের আন্দোলনের চাপে শিক্ষকদের মুক্তি দেওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করে সরকার। সরকারের কাছে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইতে সংস্থাগুলো শিক্ষকদের পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু, কেউই এই চাপে নতি স্বীকার করেননি। পরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিজের ক্ষমতাবলে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে চার শিক্ষককে মুক্ত করে দেন। অন্যান্য শিক্ষকরা পর্যায়ক্রমে অভিযোগ থেকে মুক্তি পান।’ফলে আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। পরে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।’

উল্লেখ্য, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২৪ শে আগস্টকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ‘ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।