লকডাউনে রাবি শিক্ষার্থীর ইউটিউবার হওয়ার গল্প

রায়হান ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

দিগন্ত ছুটে চলা যান্ত্রিক আর ভবঘুরে মানুষগুলোকে করোনা যেন নিমেষেই ঘরবন্দী করে ফেলেছে আজ। বারান্দা,ঘর আর ছাদটাই কেবল বিনোদনের একমাত্র জায়গা হয়ে উঠেছে। অলস সময় অতিবাহিত করতে হয় টেলিভিশন পর্দা নতুবা মোবাইল হাতে বিশ্বভ্রমণ করাই যেন আজ নিত্যদিনের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার পর্যায়ক্রমিক লকডাউনে অনেকের ঘর-ই হয়ে উঠেছে কর্মক্ষেত্র। অন্যদিকে করোনার সেই করাল গ্রাসে অনেকে চাকুরিটাই হারিয়ে হয়েছে নিঃস্ব ও বিপর্যস্ত।

করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে জীবনের আবহমান ছন্দপতনের কাছে কেউ হয়েছে হতাশ, রিক্ত ও শূন্য। কেউ বা হার না মেনে নিজের মেধা, শ্রম ও কর্মপ্রচেষ্টা দিয়ে সৃষ্টি করেছে সফলতার এক নতুন গল্প। যেই গল্পের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে হাজারো রাত্রি যাপনের অক্লান্ত পরিশ্রম। বারংবার ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে আসার অসার স্মৃতি। হতাশা আর বিষন্নতা ঘেরা দুর্বিষহ সময়ের চিত্ত কথন।

ঠিক এভাবেই করোনার ক্রান্তিলগ্নে জীবনের এই চরম ছন্দ পতনের মূহুর্তে নিজের চিন্তা, শ্রম, কর্মদক্ষতা আর ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের(রাবি) ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান। সৃষ্টি করছেন জীবন চলার এক নতুন গল্প।

তার জীবনের এই নতুন গল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘লকডাউন মানে-ই যেন কর্মজীবনকে গুটিয়ে চার দেয়ালে নিজেকে আবদ্ধ রাখা।করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে যখন জনজীবন বির্পযস্ত হয়ে কর্ম হারিয়ে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। ঠিক সেই মূহুর্তে কর্মহীন এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কিছু করার স্বপ্ন দেখেছি আমি।আর সেই স্বপ্ন থেকেই নতুন গল্পের যাত্রা শুরু।

করোনার লকডাউনে যখন সকল কার্যক্রম অচল হয়ে সকলকে ঘরবন্দী হতে হলো। ঘর, বারান্দা আর ঘরের ছাদটাই যখন একমাত্র বিচরণের প্রাণকেন্দ্র। আর সেই প্রাণকেন্দ্রে যখন মনোরঞ্জনের একমাত্র হাতিয়ার টেলিভিশন আর মোবাইল ফোন। বেস! হয়ে গেল সেখান থেকেই আমার চার দেয়ালের আরালে বেড়ে উঠা নতুন গল্পের সূচনা!

এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছিলাম ইউটিউব থেকে নাকি টাকা ইনকাম করা যায়! মোটেও পাত্তা দেই নি! ধূর আজাইরা সময় নষ্ট ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম তার কথা। কিন্তু করোনার লাগামহীন লকডাউনে কেন জানি আমার চৈতন্য হলো। দেখি না, কিভাবে টাকা ইনকাম হয়? শুরু হলো অনুসন্ধান। জানতে পারলাম ভার্চুয়াল জগতের কিছু কারিষ্মাতি। মনের মধ্যে পেলাম একটা অপার সম্ভাবনার হাতছানি। তাই এই অলস সময়ে ইউটিউবকেই বেছে নিলাম অবসর যাপনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে।তারপর শুরু হল যুদ্ধ।

খুলে ফেললাম -‘সহজ কথার মানুষ’ নামে নিজস্ব অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কি দিয়ে কি শুরু করব। ফলে একটু থমকে স্থির হলাম।তারপর সমসাময়িক কিছু নিউজ দিয়ে কাজ করা শুরু করলাম।কিন্তু শত কষ্টের শ্রম যেন ভাগাড়ে যাচ্ছিল। নেই কোন ভিউ,নেই সাবস্ক্রাইব! হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম।কিন্তু হাল ছাড়লাম না!

আবার দীপ্ত প্রত্যয়ে নিজেকে সতেজ করে কাজ শুরু করে দিলাম নতুন উদ্যোমে। নিয়মিত নতুন নতুন ভিডিও বানাতে শুরু করলাম। সমসাময়িক বিষয়ে জণগণের আগ্রহের দিকে নজর দিয়ে ভিডিও আপলোড করতে থাকলাম। ফলে চ্যানেলটি সবার নজরে আসতে শুরু করল। ধিরে ধিরে ভিউ বাড়তে লাগলো।

কিন্তু হঠাৎ এক পর্যায়ে চ্যানেলটিতে একটা কপিরাইট স্ট্রাইক পরে যায়। মন ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। মূহুর্তেই মনে হতে লাগল সব শ্রম যেন জলে গেল!

তারপরও আশাটা বাঁচিয়ে রাখলাম। কোথায় যেন শুনেছি-‘আশায় বাঁচে নীলাশা, জীবনটা পুষ্প সজ্জা নয়’। তো আমি কেন পারবনা? আমি তো ছেলে মানুষ! হা হা হা..

কাজটা করা বাদ দিলাম না।দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে চালিয়ে গেলাম কাজ। অবশেষে দীর্ঘ পাঁচমাস পর আমার চ্যানেলেটি ইউটিউবে মনিটাইজেশন পাওয়ার জন্য চার হাজার ঘন্টা এবং এক হাজার সাবসক্রাইবের রুলস পূরণ করল। আনন্দে আত্মহারা হতে ইচ্ছে করতেছিল এই ভেবে যে, অবশেষে ইউটিউবের খাতাই নাম তুলতে সক্ষম হতে চলেছি। ফলে এক বুক আশা নিয়ে মনিটাইজেশন পাওয়ার জন্য ইউটিউব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলাম। কিন্তু ফের হতাশার চাদরে নিজেকে আড়াল করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ইউটিউব কর্তৃপক্ষ মেইল করে জানিয়ে দিল-‘আমি ইহার যোগ্য নই’।

শুধু কি তাই! এভাবে চার চার বার আমাকে রিজেক্টশন দিয়েছিল এই ইউটিউব কর্তৃপক্ষ। এমনি কাজকর্মহীন করোনার অন্তিমলগ্নে বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছি। অন্যদিকে এতদিনের সময়, শ্রম সব জলে যাচ্ছে ভেবে দুঃখ-কষ্টে সব ছেড়ে একদিকে চলে যেতে ইচ্ছে করছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম চলেই যাব একদিকে এগুলো আজাইরা কাজ সব বাদ! কিন্তু সেদিন বিদ্যুৎ বিহীন সন্ধ্যায় হঠাৎ মোমবাতির দিকে তাকিয়ে আমার দিব্যকর্ণে একটু আশার বাণী শুনতে পেলাম- ‘অন্যে মাঝে আলো ছড়াতে হলে, আগে সেই আলোয় নিজেকে পোড়াতে হয়’।

তারপর আর কি! শেষ ঝুকিটা আর একবার নিয়ে প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আর একবার। চলছে কাজ আপন মনে চরম উদ্যোমে।
অবশেষে পঞ্চমবার আবেদন করে আপ্রুভাল লেটারটা হাতে পেলাম! আর আমিও একটা ছোটখাট ইউটিউবার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। এখন আমার ইউটিউবে ৮৬০০ সাবস্ক্রাইবার, মনিটাইজেশন চালু আছে।

সেই আগ্রহে খুলে ফেললাম আরও একটা চ্যানেল। নাম দিলাম-‘গ্লোইং বিডি নিউজ’ (Glowing BD News)। আর সেটাও এখন ৩৩০০ সাবস্ক্রাইবের ঘরে, চালু আছে মনিটাইজেশন।

অবশেষে এই লকডাউনে জীবনের সাথে যুক্ত হলো ইউটিউবার হওয়ার এক নতুন গল্প। আর আমি হয়ে গেলাম একজন ইউটিউবার।