লালমনিরহাটে পিটিয়ে হত্যার পর মৃতদেহ পোড়ানোর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও লালমনিরহাট সংবাদদাতা:

বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় একজন ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মৃতদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

লালমনিরহাট জেলার পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা জানিয়েছেন, তদন্তে ঘটনার সঠিক কারণ জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

যদিও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ করেছেন।

গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশ সুপার বলেছিলেন, তারা প্রাথমিকভাবে জেনেছেন যে, নিহত ব্যক্তিসহ দু’জন পাটগ্রামের বুড়িমাড়ী এলাকায় একটি মসজিদে গতকাল আছরের নামাজ পড়তে গিয়েছেলেন।

নামাজের পর তিনি কোরআন শরিফ রাখার জায়গায় পা দিয়ে অবমাননা করেছেন-এমন গুজব ছড়ায়। তখন শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ঐ ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং হত্যার পর মৃতদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

তবে তিনি জানিয়েছেন, এখন স্থানীয় লোকজন পুলিশের কাছে ঘটনা সম্পর্কে নানারকম তথ্য দিচ্ছে। পুলিশ এখন ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে।

পিটিয়ে হত্যা এবং মৃতদেহ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তবে ঘটনার ব্যাপারে পুলিশ এখনও সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ঘটনাস্থলে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজগুলো দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।

ওই এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা।

তবে নৃশংস ওই ঘটনায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে তিনি জানান।

গতকালই তোহিদুন্নবী নামের এক ব্যক্তি নিজেকে নিহতের ভাই দাবি করেছেন ।

তিনি বলেছেন, তাদের বাড়ি রংপুরে। তার ভাইকে পিটিয়ে হত্যার পর আগুন দিয়ে পোড়ানোর এমন ঘটনা শোনার পর তারা হতবাক হয়েছেন।

নিহত শহীদুন্নবী রংপুর শহরের শালবন রোকেয়া সরণি এলাকার আবদুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে এবার এইচএসসির পাস করেছেন ও ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

শুক্রবার সকালে শহীদুন্নবীর শালবনের বাসভবনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসীসহ আত্মীয়স্বজনের ভিড়। শহীদুন্নবীর স্ত্রী জেসমিন আক্তার আহাজারি করছেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক সহজ সরল ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। যারা গুজব ছড়িয়ে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই।’

স্বজন ও এলাকাবাসী জানান, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে ২০১৬ সালে চাকরি চলে যাওয়ায় শহীদুন্নবীর একমাত্র উপার্জনপথ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শে সব সময় ওষুধ সেবন করতেন।

শহীদুন্নবীর বোন হাছনা আক্তার বলেন, মানসিক যন্ত্রণার কারণে তাঁর ভাই ভারতীয় ওষুধ খেতেন। তাই সীমান্তের বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকায় চেনাজানা মানুষজনের কাছে ওষুধ আনাতে গিয়েছিলেন।

এদিকে নৃশংসভাবে শহীদুন্নবীকে হত্যার প্রতিবাদ ও দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবিতে সচেতন রংপুরবাসীর ব্যানারে শুক্রবার বিকেলে রংপুর নগরের পায়রা চত্বর এলাকায় মানববন্ধন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী রাশেদ মাহবুব রাব্বান।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, বাসদ জেলা শাখার সমন্বয়ক আবদুল কুদ্দুস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিজুল ইসলাম, সৈয়দ মামুনুর রহমান প্রমুখ।

সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, শনিবার দুপুর ১২টায় রংপুর জিলা স্কুল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি ও বাদ জোহর জিলা স্কুল মাঠে শহীদুন্নবীর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।