“শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার শিক্ষা আজ বড্ড প্রয়োজন”

অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম:

লাতিন শব্দ ” মোরালিটাম” যার অর্থ চরিত্র, ভদ্রতা,সঠিক আচরণ। নৈতিকতাকে একটি আদর্শ মানদণ্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা,ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সমগ্র পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয় সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংঞ্জায়িত করা হয়।

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব,আর এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে তার মনুষ্যত্ব, বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তি।

একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন তখনই নিশ্চিত হয়,যখন সে দেশে সঠিক মাত্রায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা হয়।

নীতির প্রতি মূল্যায়ন,সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেই আসে নীতিবোধ আর এই নীতিবোধ থেকেই আসে নৈতিকতা।

তিব্বতীয় নেতা দালাইলামার উক্তি, তিনি বলেছেন,” হোয়েন এডুকেটিং দ্যা মাইন্ডস অফ আওয়ার ইয়ুথস, উই মাস্ট নট ফরগেট টু এডুকেট দেয়ার হার্টস “।

প্রকৃতপক্ষে শিশুকাল থেকেই নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া অতি প্রয়োজন। আর শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ প্রোথিত হয় পরিবারে ; তা বিকশিত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর চর্চা হয় সমাজে।
তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা ও চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।

নৈতিকতার ভীত শিশুকাল থেকেই শক্ত না হলে পরবর্তী জীবনে তা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্হা ও পারিবারিক শিক্ষা ব্যবস্হার গলদের কারণে আমাদের নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে।

পাঠ্যসূচীতে এই ব্যাপারে খুব কমই অন্তর্ভুক্ত আছে। তাই আজ বড্ডই প্রয়োজন শিক্ষা পাঠ্যসূচীতে নৈতিকতার প্রয়োজনীয় বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করা।

এক্ষেত্রে আমরা জাপানের শিক্ষা ব্যবস্হার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি। জাপানিরা নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুশৃঙ্খল অমায়িক চরিত্রের অধিকারী একটি জাতি হিসেবে পরিচিত।

জাপানের শিক্ষা ব্যবস্হার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা। তাদের বিশ্বাস আগে নীতি- নৈতিকতা, পরে পাঠ্য শিক্ষা।

জাপানের ১০ বছর পর্যন্ত কোনো ধরনের পূঁথিগত বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক বিকাশের দিকেই বিশেষভাবে নজরদারি করা হয়।

স্কুল জীবনের প্রথম ৩ বছর মেধা যাচাইয়ের জন্য নয়, বরং ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্ঠাচার, দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো হয়।
স্কুলকে জীবন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার স্হান হিসেবে না দেখিয়ে জীবনকে সুন্দর করার একটি মিলনস্থান হিসেবে প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে জাপান সরকার।

জাপানে শিশুদের স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি আদব-কায়দা শেখানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে।
গুরুজনদের সম্মান করা ; মানুষের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয়া, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি শিক্ষা একেবারে ছোটবেলায় জাপানিদের মনে গেঁথে দেয়া হয়।

স্কুলে ভর্তির পর থেকে ৪ বছর পর্যন্ত শিশুদের তাদের দোষ- গুনের মানদন্ডে বিচার করা হয় না। তাদের মধ্যে কে ভালো বা কে খারাপ সে বিচার না করে বরং কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে শিক্ষা দেয়া হয়।
এর পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা উচিত বা কার সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় ইত্যাদি নীতিগত শিক্ষা প্রদানের ওপর জোর দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি প্রকৃতির মধ্যে পশুপাখির মধ্যে কেমন আচরণ করতে হয়– সেই শিক্ষাও ছাত্রছাত্রীরা স্কুল থেকেই পায়।

তাছাড়া শিশুরা অল্প বয়সেই স্বনির্ভরতা অর্জন করে, জামাকাপড় পরা, নিজ হাতে খাবার খাওয়া, নিজের জিনিস নিজেই গুছিয়ে রাখার মতো ছোট ছোট কাজ হাতে ধরে শিখিয়ে দেন শিক্ষকরা।

তাহলে পারিবারিকভাবে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষার হাতেখড়ি হয়।তারপর স্কুলে শিক্ষকরা এই শিক্ষা তাদের মনের গভীরে প্রথিত করেন।আর এই জন্যই প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচীতে নৈতিকতা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।

সাথে সাথে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।কারণ আমাদেরকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত হতে হলে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ আমরা যে নীতি – নৈতিকতা বহির্ভূত কর্মে জড়িয়ে পড়ি, তার মূল কারণ আমাদের মনের গভীরে নৈতিক শিক্ষার অভাব।শুধু শিক্ষা নিলে হবে না সাথে সাথে নিজের জীবনে সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়নের মানসিকতাও থাকতে হবে।তাহলেই একটি কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

যে রাষ্ট্রে থাকবে না প্রতারণা, ঠকবাজি, জোচ্চুরি,অন্যায় আচরণ, অন্যের অধিকার হরণ,অন্যায় ও প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়া,জাল- জালিয়াতি, ধর্ষণের মত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড ইত্যাদি।

থাকবে শুধু মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, ন্যায় আচরণ, অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ উপার্জন, সমাজে হক প্রতিষ্ঠা, ধর্ষণ, খুন- রাহাজানির প্রতি ঘৃণা।

তাহলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হবে। সরকার জনগণকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র উপহার দিতে পারবে। (চলবে)

লেখকঃ শিক্ষাবিদ ও গবেষক।