শীতকালীন সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত শাহ্ নগর নার্সারি মানুষ

সাখাওয়াত হোসেন জনি, বগুড়া প্রতিনিধি:

৪ বছর আগে শাহ্ নগর গ্রামে সর্বপ্রথম ট্রে-নার্সারি স্থাপন করেন আমজাদ হোসেন নামের এক কৃষক। তার সাফল্য দেখে গ্রামের আলাল, দুলাল, জাহিদুল এবং উজ্জল ট্রে-নার্সারি স্থাপন করেন।

রোগ-বালাই অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় এবং ফসলের ফলন বেশি হওয়ায় ট্রে-তে চারা উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছে কৃষক। শীত মৌসুম ঘিরে শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদনে সরব হয়ে উঠেছে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার শাহ্ নগর ও আশপাশের গ্রামগুলো।

২শ’ ২০টি সবজি নার্সারিতে নিবির পরিচর্যায় বেড়ে তোলা হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল জাতের মরিচ, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি’র গুণগত মানসম্পন্ন কয়েক কোটি চারা। প্রতিকুল আবহাওয়ায় চারা উৎপাদন যাতে ব্যহত না হয় সে জন্য পলিথিনের ছাউনীতে ঢেকে দেয়া হয়েছে নার্সারির বেডগুলো।

বছরে ৫ মাস মাটিতে চারা উৎপাদন কাজ চলে। বাকি সময় নার্সারি শ্রমিকদের কাঁধে চেপে বসে বেকারত্ব। তাই নিজেদের বেকারত্ব ঘোঁচাতে বারো মাস চারা উৎপাদনের আধুনিক কলা-কৌশলও রপ্ত করেছেন শাহ্ নগর গ্রামের মানুষেরা। ‘ট্রে-নার্সারি’ স্থাপন করে তারা সারা বছর সবজি চারা উৎপাদন করছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এসব চারা বাজারজাত শুরু হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার নার্সারি পল্লী খ্যাত শাহ্ নগর গ্রামের মানুষেরা। বাপ-দাদার আদি পেশা নানা রকম ফসলের চাষাবাদ। সময়ের সাথে বদলেছে চাষাবাদের ধরণ। ফসলের পরিবর্তে সবজি চারা উৎপাদনে জড়িয়ে পড়েছেন এ গ্রামের কৃষিজীবি মানুষেরা।

বিগত ৩ যুগে শাহ্নগরের এ কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার ৭-৮টি গ্রামে। সুলভ মূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন চারা পাওয়ায় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড় সহ দেশের ২৪টি জেলার মানুষ শাহ্ নগর গ্রাম থেকে সবজি চারা সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, ৫ মাস চারা উৎপাদন শেষে সবজি নার্সারি গুলোতে বছরের বাকি সময় চলে সবজি উৎপাদনের কাজ। হাইব্রিড পেঁপে, টমেটো, মরিচ, শশা, খিরা, শিম, ধনিয়া পাতা, রাধুনি পাতা, বরবটি, বেগুন, গাজর মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, উৎপাদন করছেন। স্থানীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে এসব সবজি ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এদিকে জমির আইলে পতিত জায়গায় ‘ফার্ষ্ট লেডি’ নামের হাইব্রিড পেঁপে ফলিয়ে বাড়তি পয়সা কামাচ্ছেন সবজি চাষীরা। শাহ্ নগর গ্রামের আমজাদ হোসেন ও আব্দুস সালাম, বড়পাথার গ্রামের আজিজুল, জোঁকা গ্রামের জাফর মাস্টার ফসলী জমির আইলে হাইব্রিড পেঁপে ‘ফার্ষ্ট লেডি’ চাষ করেছেন।

তারা জানান, প্রতি বিঘা জমির চারধারের আইলে ১শ’ পেঁপে চারা লাগানো যায়। প্রতিটি গাছে গড়ে ৫০-৬০ কেজি পেঁপে ধরে। এ হিসেবে ১ বিঘা জমির আইল থেকে ৫-৬ মেট্রিক টন পেঁপে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। যার বাজার মূল্য ৭০-৮০ হাজার টাকা।

শাহ্ নগর গ্রামে নার্সারি স্থাপন করে বানিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চারা উৎপাদনের জনক ও শাহ্ নগর সবজি নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, বেকারত্ব ঘোঁচাতে ১৯৮৫ সালে তিনি সর্বপ্রথম বানিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চারা উৎপাদন শুরু করেন। কিন্তু এ কাজের কলা-কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় লাভের মুখ দেখেননি।

পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পৃথক পৃথক ভাবে চারা উৎপাদনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং চারা উৎপাদন করে লাভবান হন। এরপর থেকে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বরং তার সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আশপাশের অনেকেই চারা উৎপাদনে জড়িয়ে পড়েন।

দিন দিন এ কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন স্থানীয়রা। দীর্ঘ ৩ যুগ ধরে সবজি চারা উৎপাদনের কাজ চলতে থাকায় শাহ্ নগর এখন ‘চারার নগর’-এ পরিণত হয়েছে। সেই সাথে নার্সারি গুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছে সহস্রাধিক নারী-পুরুষের। গড়ে উঠেছে সার, বীজ, কীটনাশকের দোকান।

দূর-দুরান্ত থেকে চারা কিনতে আসা মানুষের সেবায় গড়ে উঠেছে খাবারের হোটেল। চারা পরিবহণের কাজে কাজ মিলেছে রিক্সা-ভ্যান, অটো টেম্পুর চালকদের। সব মিলিয়ে সবজি চারা উৎপাদনের কাজটি এখন শাহ্ নগর গ্রামের মানুষের কাছে আশীর্বাদ।

শাজাহানপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুরে আলম জানান, উপজেলার শাহ্ নগর ও আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষ খুবই পরিশ্রমী। এখানে তারা সবজি চারা উৎপাদন করে থাকে। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত তাদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়।