সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের মহান শিক্ষা দিবস আজ

রায়হান ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের মহান শিক্ষা দিবস ১৭ সেপ্টেম্বর। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে ১৯৬২ সালের এই দিনে এসএম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে ঢাকার রাজপথ কেঁপে উঠেছিল। মিছিল মিটিংয়ে উত্তাল হয়েছিল সমগ্র দেশ।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ১৭ই সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ও-ই দিন সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিল হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষকের ও সাধারণ জনতা।সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয় রাজপথে। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে- এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

কিন্তু হাইকোর্টের সামনে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। মিছিলকারীরা সংঘাতে না গিয়ে আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। তখন পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। এতে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না-জানা অনেকেই।

ওই দিন সমগ্র দেশে পালিত হওয়া সকল মিছিলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। ফলে টঙ্গীর ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিক শহীদ হন।

কেন হয়েছিল এই আন্দোলন?

স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে জাতীর মেরুদণ্ডে আঘাত হানে। শরীফ কমিশন নামে খ্যাত এসএম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। এতে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা ছিল তা প্রকারান্তরে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে গিয়েছিল।

প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত শরীফ কমিশনের ওই প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, হরফ সমস্যা, প্রশাসন, অর্থবরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করেন এবং ১৯৬২ সাল থেকে সেটা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন।

শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি কাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক,
৩ বছরে উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়।

উচ্চশিক্ষা ধনিকশ্রেণীর জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এই প্রস্তাবে। এজন্য পাস নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল শতকরা ৫০, দ্বিতীয় বিভাগ শতকরা ৬০ এবং প্রথম বিভাগ শতকরা ৭০ নম্বর।

এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার প্রস্তাব করা হয়। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমে রাখতে ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল।রিপোর্টের শেষ পর্যায়ে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল।

ফলে আইয়ুবের এই বিধ্বংসী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন অবস্থান নেয়। ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্ব স্ব দাবির ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট মাস জুড়ে আন্দোলন সংগ্রাম চলিয়ে যান। অবশেষে ১৯৬২ সালের এই দিনে স্বৈরাচারের শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে বাঙ্গালি জীবন দিয়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করে।ফলে বাঙ্গালির আন্দোলন সংগ্রামে যে আপসহীন ইতিহাস রচিত হয়েছে। মূলত তারই স্মরণে প্রতিবছর এই দিনকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।