‘সাংবাদিক রোজিনাকে হেনস্থা যৌন হয়রানির আওতায় পড়ে’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও হেনস্থাকারী কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ৫ টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠন।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতি, নারীপক্ষ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্লাষ্ট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আজ এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এই ৫ টি সংগঠন এই দাবি জানায়। সংগঠনগুলো প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একটি কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ণ এবং গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

তারা বলেন নারী ও পুরুষ মিলে রোজিনা ইসলামকে আটকে রেখে যেভাবে হেনস্থা করেছে, তা যৌন হয়রানির আওতায় পড়ে এবং তা স্পষ্টতই ফৌজদারী অপরাধ। প্রয়োজনে যেকোন আইনী সুবিধা দেয়ার জন্য তারা প্রস্তুত আছেন।

তারা বলেছেন এই আটকে রাখার ঘটনা দেশের সংবিধান পরিপন্থী। একজন সাংবাদিককে বিশেষ করে একজন নারী সাংবাদিককে আটক রাখার ঘটনাটি নিন্দনীয়। রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না করে, থানা হাজতে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনাটি অমানবিক।

সংবাদ সম্মেলনে ৫ টি সংগঠনের পক্ষ থেকে বক্তারা জানতে চান প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বা অন্যকোন ব্যক্তিকে সরকারের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা কি আটকে রেখে হেনস্থা করতে পারেন? কোন ন্যায্য কারণ ছাড়া বাংলাদেশের কোন নাগরিককে ৫ ঘন্টা কেন, ৫ সেকেন্ডও আটকে রাখার অধিকার কারো নেই।

তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে নথি ফাঁস হলে দেশের গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হতে পারে, সেটা কিভাবে একজন প্রাইভেট সেক্রেটারির টেবিলে বিনা পাহাড়ায় পড়ে থাকে? রোজিনা ইসলাম কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন নথি ”চুরি” করেছেন, তা জনগণ জানতে চায়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নীনা গোস্বামী, নারীপক্ষের তামান্না খান, মহিলা আইনজীবি সমিতির এডভোকেট সালমা আলী এবং ব্লাষ্ট থেকে ব্যারিষ্টার সারা হোসেন এবং ব্যরিষ্টার শারমিন আক্তার। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শাহীন আনাম।

সংবাদ সম্মেলনটি পরিচালনা করেন এমজেএফ এর রীণা রায় এবং প্রতিবাদ লিপিটি উপস্থাপন করেন শাহানা হুদা। সএডভোকেট সালমা আলী বলেন আদালত চাইলে রোজিনাকে জামিন দিতে পারতো। কেউ কি রোজিনাকে এই তিনদিন ফিরিয়ে দিতে পারবে? নারীপক্ষের তামান্না খান বলেন এরকম একজন সাংবাদিককে যদি এইভাবে হয়রানি করা হয়. তাহলে বাকিদের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

ব্যারিষ্টার সারা হোসেন বলেন, ফ্যাকট ফাইন্ডিং করে আইনী সংগঠনগুলো মামলা চালাতে পারে। নীনা গো¯^ামী বলেন এইভাবে হেসন্থা করার অধিকার কারো নাই। শাহীন আনাম বলেন রোজিনা অনেক যুদ্ধ করে আজকে সাংবাদিকতার এই স্থানে এসে দাড়িঁয়েছে। অথচ আজ তাকে চুরির অপবাদ নিয়ে জেলে দেয়া হলো। তার ছোট সন্তানটির ট্রমা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।

প্রতিবাদলিপিতে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে তথ্য প্রদানে বাধা সংক্রান্ত বিধানাবলী, তথ্য অধিকার আইনের বিধানাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক হলে, তথ্য অধিকার আইনের বিধানাবলী প্রাধান্য পাবে। এমনকী দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন ১৯২৩ এর ক্ষেত্রেও। কাজেই এই সংবাদ সম্মেলন থেকে দাবি জানানো হচ্ছে যে তথ্য অধিকার আইনের এই ধারা ও ধারা সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী সার্বিকভাবে প্রয়োগ করা হোক, যাতে দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন ১৯২৩ এর মতো পুরানো ও জনগণের জানতে চাওয়ার অধিকারের পরিপন্থী আইন অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বক্তারা আরো বলেন নানাধরণের অসুস্থতায় আক্রান্ত রোজিনাকে কেন কারাগারে নেয়া হলো? আমরা জানি কারাগারে স্থান সংকুলানের ক্ষেত্রে কয়েদীর ভয়াবহ চাপ আছে। সেখানে রয়েছে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়। দুপুর থেকে হেনস্থা করে, পুলিশ ডেকে হাসপাতালে নেয়ার কথা বলে শাহবাগ থানায় পাঠানো হলো কেন?

হেনস্থার পর অসুস্থ হলেও তাকে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে নেয়া হয়নি। থানায় তাঁকে রাতভর আটকে রেখে সকালে আদালতে নেওয়া হয়, যা রোজিনার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়েছে বলে সংগঠনগুলো মনে করে। তাছাড়া একজন নারী হিসেবে রোজিনা ইসলামের জামিন পাওয়াটা অধিকার। তারা জানতে চান তিনি কি তথ্য-প্রমাণাদি নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন, সাক্ষীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন অথবা বিচারের মুখোমুখি না হয়ে পালানোর চেষ্টা করেছেন?

৫ টি সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয় সংবাদমাধ্যম যেমন জনগণের সেবার জন্য, তেমনি দেশের ভাল, মন্দ, দুর্নীতি, মানুষের দু:খ-দুর্দশার কথা জানিয়ে সরকারের হাতকে শক্তিশালী করাও সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব। সংবাদমাধ্যমকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা রাষ্ট্রের গোপন তথ্য জনগনকে জানাতে পারে। শুধুমাত্র মুক্ত সংবাদমাধ্যমই পারে দেশে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথ প্রশস্ত করতে এবং সবধরণের প্রতারণাকে জনগনের সামনে তুলে ধরতে।