সীতাকুন্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় এক‌দিন

ইয়াছির আরাফাত সবুজ:

একবছর আগের কথা তখন করোনা ভাইরাস শব্দটা জানতো না কেউ। পূজার ছূ‌টি শে‌ষে ক্যাম্পাস খু‌লে‌ছে মাত্র। অ‌নেক দিন হ‌য়ে গেল কোন টু‌রে যাওয়া হয় না । তাই হঠাৎ সিদ্ধান্ত নি‌য়ে নিলাম আজ রা‌তে সীতাকুন্ড যাব। উ‌দ্দেশ্য চন্দ্রনাথ পাহাড় এর চূড়ায় উঠব। তাই রা‌তেই ট্রে‌নে ক‌রে বে‌ড়ি‌য়ে পরলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ।

সকাল বেলা পৌছালাম চট্টগ্রাম, তারপর সেখান থে‌কে বা‌সে ক‌রে রওয়ানা করলাম সীতাকুণ্ডের উ‌দ্দে‌শ্যে। সীতাকুন্ডে পৌ‌ছে আমরা সকা‌লের নাস্তা সে‌রে নি‌য়ে একটা আটোরিক্সায় ক‌রে চন্দ্রনাথ পাহা‌ড়ে পৌছালাম। রিক্সায় ক‌রে আসার সময় ম‌নে হ‌চ্ছি‌লো সীতাকুন্ড যেন একটা মন্দি‌রের শহর । রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য মন্দির। আমরা যে পাহাড়ের চূড়ায় যাচ্ছি সেখানে নাকি দুটি শিব মন্দির আছে।

আমরা মোট ১১ জন বন্ধু ছিলাম । পাহা‌ড়ের কাছাকা‌ছি যে‌তেই দে‌খি কিছু লোক এক ধর‌নের লাঠি বিক্রি কর‌তে‌ছে। চি‌কোন বাঁশ পু‌ড়ি‌য়ে তৈ‌রি করা হ‌য়ে‌ছে লা‌ঠি গু‌লো । পাহা‌ড়ে উঠ‌তে গে‌লে এই লা‌ঠি গু‌লো নি‌য়ে উঠ‌তে হয় । এ‌তে ক‌রে একটা শক্তি পাওয়া যায়। আমরা সবাই একটা ক‌রে লা‌ঠি কি‌নে নিলাম । তারপর শুরু ক‌রে দিলাম আমা‌দের যাত্রা।

প্রথমদিকে তেমন কষ্ট না হলেও তিনশো ফুট থেকে আপনাকে উঠতে হবে খাড়া পাহাড় বেয়ে। মনে হবে এই বুঝি জানটা বেড়িয়ে যায়। কখনোবা চলতে হবে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আর অন্য দিকে খাদ নিয়ে। একবার পা ফসকালেই পড়তে হবে ২৫০-৩০০ ফুট নিচে। কোনও কোনও জায়গায় পথটা এতটাই সরু যে, দুজন মানুষ একসঙ্গে উঠা-নামা করা অসম্ভব। মাঝে মাঝে পাবেন প্রাচীনকালের তৈরি সিঁড়ি। কে কত সালে সে সিঁড়ি কেন বানিয়েছেন সাথে আছে তার নামফলকও। চারদিকে নিরব-নিস্তব্ধতার মাঝে মাঝে শুনতে পাবেন চেনা-অচেনা পাখির ডাক, দেখা মেলে ঝর্ণা।

প্রায় দেড় ঘন্টা পর আমরা পৌঁছলাম প্রথম পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে রয়েছে শ্রী শ্রী বিরূপাক্ষ মন্দির। মন্দিরে অবস্থারতরা জানতে পারলাম , এটা তাদের শিব দেবতার বাড়ি। প্রতিবছর এই মন্দিরে শিবরাত্রি তথা শিবর্তুদশী তিথিতে বিশেষ পূজা হয় এবং পূজাকে কেন্দ্র ব‌সে বিশাল মেলা হয়। এই এলাকায় বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে বড় ধরনের একটি মেলার আয়োজন করে থাকেন। যেটি শিবর্তুদর্শী মেলা নামে পরিচিত। এই মেলায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য সাধু এবং নারী-পুরুষ যোগদান করেন।

কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে ‌নিলাম আমরা। তারপর আবার রওনা হলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে। আর এই পাহা‌ড়ের চূড়ায় অব‌স্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের ১৫০ ফুট রাস্তার প্রায় ১০০ ফুটই আপনাকে উঠতে হবে খাড়া পাহাড় বেয়ে। সেখানে নিজেকে সামলে রাখা অনেকটাই কষ্টকর। অবশেষে খাড়া পাহাড় বেয়ে মাটি থেকে ১২০০ ফুট উপরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠলাম আমরা। সীতাকুণ্ড তথা চট্টগ্র‌মের সর্বোচ্চ উঁচু স্থান চন্দ্রনাথ পাহাড় । পাহাড়‌টি‌তে দাঁড়িয়ে আপনি এক‌দি‌কে দেখতে পাবেন সমুদ্র আর অন্য দিকে পাহাড়ের । প্রশান্তিতে জুড়িয়ে যাবে চোখ। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবেন উঁচু-নিচু পাহাড়ের সবুজ গাছপালার দিকে। প্রকৃ‌তির এ সৌন্দর্য দেখে আপনা‌কে আর নাম‌তে ই‌চ্ছে কর‌বে না । ম‌নে হ‌বে আ‌মি হা‌রি‌য়ে যাই এই অপরূপ সৌন্দর্যের মা‌ঝে।

এবার পাহাড় থেকে নামার পালা, আমরা উঠার সময় যেই দিক দিয়ে উঠেছিলাম সেই দিক দিয়ে নামব না। অন্য দিক দিয়ে নামব এতে করে সহজ এবং দ্রুত হয়। কিন্তু আপনি যদি উঠার সময় ভুল করেও এইদিক দিয়ে উঠতে যান তাহলে আপনার কষ্ট দিগুন হবে এটা নিশ্চিত। কারন এইদিকে সিড়ি গুলো বেশ বড় বড় তাই নামতে সুবিধা হয়। নামার সময় খুব একটা সময় লাগলো না।

পাহাড় থেকে নেমে সোজা চলে গেলাম একটি হোটেলে। খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আমরা সীতাকুণ্ডের আরও বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখলাম। তারপর রাতে বাসেই রওয়ানা করলাম ঢাকার উদ্দেশ্য। ভ্রমণ প্রিয় মানুষদের জন্য এটি একদিনের একটি অসাধারণ টুর।

চন্দ্রনাথ পাহাড় ঘুরে এসে ইবনে বাতুতার একটা কথা মনে পড়ছে ” ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে, তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে।’

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়