৬১০ কোটি টাকা ব‍্যয় থাকার পর পুরোপুরি এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে না

সিরাজুল মনির, চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান:

দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হচ্ছে এলএনজি (লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস)। আমদানিকৃত এসব এলএনজি সারাদেশে সরবরাহের জন্য বিগত তিন বছরে ৫ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৪টি পাইপলাইন চালু করা হয়েছে। তবুও পুরোদমে সরবরাহ নেই এলএনজি’র। মহেশখালীতে নির্মিত দুই এফএসআরইউ’র মাধ্যমে দৈনিক এক হাজার ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা থাকলেও আরপিজিসিএল বলছে, চাহিদা মাফিক ৭শ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, গত জানুয়ারিতে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয় গড়ে ৩ হাজার ১৬৭ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এরমধ্যে ৫৯২ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি। বাকি ২ হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস।

অন্যদিকে ৩১ জুলাই গ্যাস সরবরাহ করা হয় ৩ হাজার ১১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এখানে এলএনজি ৫৭১ মিলিয়ন ঘনফুট, আর দেশীয় গ্যাস ২ হাজার ৫৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সর্বশেষ ১ অক্টোবর ৩ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দিয়েছে পেট্রোবাংলা। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২ হাজার ৪৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ দেয়া হয়েছে ৭০১ মিলিয়ন ঘনফুট।

এরমধ্যে চট্টগ্রামের জন্য কর্ণফুলী গ্যাসকে দেয়া হয়েছে ৩৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) বলছে, বর্তমানে সারাদেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে চাহিদা অপেক্ষা সরবরাহ কম হওয়ায় সারাদেশে দৈনিক গ্যাসের সংকট রয়েছে প্রায় ৭শ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাসনির্ভর শিল্প গড়ে উঠছে না। আবার বিদ্যমান শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। যে কারণে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শতভাগ সুফল মিলছে না। এদিকে দেশে গ্যাসের সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানি ও সারাদেশে সরবরাহের জন্য ৫ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে চারটি মেগা পাইপলাইন।

এরমধ্যে ১ হাজার ৩৯ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে মহেশখালী–আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন, ৭৭৬ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত পাইপলাইন, ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকায় মহেশখালী–আনোয়ারা প্যারালাল (সমান্তরাল) গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন এবং ২ হাজার ৪৭৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম–ফেনী–বাখরাবাদ পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি. (জিটিসিএল)।

তাছাড়া আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহের জন্য সরকারি চুক্তির মাধ্যমে মহেশখালীতে দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ এন্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট অর্থাৎ এলএনজি মজুত ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার ভাসমান টার্মিনাল) নির্মাণ করে এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড।

টার্মিনাল দুটি হতে দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নির্মিত সঞ্চালন পাইপলাইনের মাধ্যমে সারাদেশে সরবরাহের কথা রয়েছে। তবে বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি হতে দৈনিক ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দিতে সক্ষম হচ্ছে আরপিজিসিএল।

মহেশখালী– আনোয়ারা প্যারালাল (সমান্তরাল) গ্যাস সরবরাহ প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আরিফুল হক ফকির বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের মূলকাজ শেষ হয়েছে। এখন প্রকল্পে পিসিআর (প্রজেক্ট ক্লোজিং রিপোর্ট) তৈরি হচ্ছে। মহেশখালী থেকে নির্মিত দুই পাইপলাইনই ব্যবহার হচ্ছে।

চিটাগাং–ফেনী–বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন প্যারালাল পাইপলাইন প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক আইনুল কবির দুরন্ত নিউজকে বলেন, ‘আমদানিকৃত এলএনজি সারাদেশে সরবরাহ দেয়ার জন্যই মূলত চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট থেকে ফেনী হয়ে বাখরাবাদ পর্যন্ত ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে। পাইপলাইন দিয়ে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাস সঞ্চালনও শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পের আওতায় মীরসরাইয়ের বড়তাকিয়া, কুমিল্লার বিজরা ও মুরাদনগরে তিনটি মিটারিং স্টেশন পয়েন্ট নির্মাণ হচ্ছে। এই মিটারিং স্টেশনগুলোর মাধ্যমে পেট্রোবাংলার বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। মীরসরাইয়ের মিটারিং স্টেশনটির নির্মাণ কাজ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে।’ নির্মিত হলে ওই স্টেশনটি দিয়ে মীরসরাই অর্থনৈতিক জোনের জন্য গ্যাস সরবরাহ দেয়া সম্ভব হবে বলে জানান এ প্রকল্প পরিচালক।

আরপিজিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) মো. রফিকুল ইসলাম দুরন্ত নিউজকে বলেন, চলতি সপ্তাহ থেকে মহেশখালীর দুই এফএসআরইউ’র মাধ্যমে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে এলএনজির সরবরাহও বাড়ানো হবে। বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।যদিও প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গ‍্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার খবর পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে কেজিডিসিএল এর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুরন্ত নিউজকে বলেন, সঞ্চালন সমস্যার কারণে হয়ত পুরোপুরি এলএনজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে গ‍্যাসের চাহিদার ও একটা বিষয় থাকে বলে তিনি উল্লেখ করে বলে মিটারিং স্টেষন চালু হলে গ‍্যাস সরবরাহে কোন ঘাটতি থাকবেনা।