‌রক্ত গোলাপের হাসি

সাবিকুন নাহার সিফা:

আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। ঝড়ো বাতাস।” এই অবেলায় ঝড় শুরু হইল , ওরে ময়না , আর কতো পরে পরে ঘুমাবি । বলি বেলা তো অনেক হইলো । সন্ধ্যা হইয়া যাইতেছে, ঝড় শুরু হওয়ার আগে মাঠ থেইকে গরুটা নিয়া আয়। আমি আর কতো করতাম। ও ময়না ” । চোখ রগরাতে রগরাতে ঘুম থেকে উঠেই ময়না বলল , “তোমাগো লাইগা একটু ঘুমাইতেও পারি না। এই ছুড জানডারে দিয়া আর কতো কাম করাইবা।” অনেক জোরে বাতাস শুরু হয়েছে। রান্নাঘর থেকে আবারও ময়নার মা জমিলার ডাক , ” কিরে ময়না গেলি না এখনো ” । ” যাইতাছি গো যাইতাছি ” । রাগে গজগজ করতে করতে গরু আনতে গেল ময়না। ” তোর লেইগাই আমার ঘুম ভাঙ্গাইলো। বলি তোর এত ঘাস খাইতে হয় কেন‌, নিজে নিজে বাড়ি যাইতে পারস না” । সব রাগ গরুর উপর ঝেড়ে শান্তিবোধ করলো ময়না। বাড়িতে যাওয়ার পরপরই বৃষ্টি শুরু হলো। অজপাড়া গাঁ, কিছু বাড়ি ছাড়া বাকি গুলোতে বিদ্যুৎ নেই। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, কুপি বাতি জ্বলছে ময়নাদের রান্নাঘরে। ময়না পুতুল খেলায় ব্যস্ত। আবারও মায়ের ডাক , ” ও ময়না , বৃষ্টি তো একটু ছাড়লো , দরজায় দাঁড়ায়া দেখতো তোর বাপে আইলো নাকি। বৃষ্টির লেইগা মনে হয় বাজারেই আটকা পড়ছে।”

” না মা , আব্বায় এহনো আহে নাই ‌” । বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ, বাতাস বইছে এখনো। এমন সময় খিড়কী দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। ” তুই ঘরে থাক ময়না , আমি যাইয়া দেখতাছি , এত রাইতে তোর বাইরে যাইতে হইবো না ” । দরজা খলল জমিলা। ” তোমার আইতে এত দেরি লাগে, ঝড়ের মধ্যে দুইডা মাইয়া মানুষ রাইখা কই কামাই করবার গেছিলা শুনি”। “খাঁড়াও কইতাছি ,, আগে ঘর থেইকা লঙ্গি আর গামছাডা আনো‌, ভিইজা গেছিগা ” ।

” আইচ্ছা আনতাছি ” , বলে জমিলা ঘর থেকে কাপড় নিয়ে আসলো। ময়নার বাবা রহিম মিয়া ঘরে ঢুকে ময়না কে খুঁজতে লাগল। ” ময়না ও ময়না , কই রে মা, দেখ তোর লাইগা কি আনছি ” । ” আব্বা তুমি আইছো। এত দেরি করলা কেন। জানো মায়ে আইজকা বিকালে আমারে ঘুমাইতে দেয় নাই”। ” দেখ তোর লাইগা কি আনছি ” । ” ওমা , এত্ত বড় আম , কই পাইলা আব্বা ” । ” আসবার সময় রাস্তায় পাইছি । মনে হয় ঝড়ে পড়ছিল , মা রে ক কাইটা দিবো ” । ” আইচ্ছা “।

” আমডা তো মেলা মিষ্টি আব্বা। আমগর বাড়িতেও এমন একটা আম গাছ লাগাইবা আব্বা , বড় হইলে অনেক আম হইব , খুব মজার আম ” । ” ঠিক আছে মা , লাগামু । কি গো ময়নার মা খাওন কি দিবা নাকি,” । ” আনতাছি “।

” আরে , মাছের মাথাডা আমারে দেও কেন । ময়নারে দেও , ওর বুদ্ধি হইব, পড়ালেহা কইরা অনেক বড় হইব “। ” আইচ্ছা , দিতাছি । এহন কও এত দেরি করলা কেন আইতে “। ” পোলাডার কোন খবর আইছে কিনা জানবার লেইগা মাস্টারসাবের বাড়িত গেছিলাম । পরে ঝড় শুরু হইল আর আসবার পাইলাম না”। আঁতকে উঠে জমিলা , ” পোলাডার কি কোন খবর পাইলা , আইজ কত বছর হয় পোলাডারে দেহি না , কোন খবর পাই না “। ” না গো ময়নার মা , কোন খবর পাইলাম না “। কেঁদে ওঠে জমিলা । ” কাইন্দ না মা , ভাই নাই তো কি হইছে, আমি আছি তো তোমাগো দেখার লেইগা। “

রাতে শুয়ে পড়েছে সবাই। ছোট ছোট দুইটা ঘর। এক ঘরে ময়নার মা বাবা , অন্য ঘরে ময়না। ময়না নয় বছরের ছোট এক মেয়ে। গাঁয়ের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। লেখাপড়ায়ও বেশ ভালো। বাবা কৃষি কাজ করে যা পায় তা দিয়েই দিন যায়। ময়নার বাবা মা ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু তার ঘুম আসছে না। বারবার ভাই এর কথা মনে পড়ছে। ময়না ভাবে ,” ভাই আমারে কত আদর করত , রাইতে খাওয়ায় দিত , মেলায় লইয়া যাইত। কেন যে ঢাকা গেল গা। ” ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায় ময়না।

ময়নার বড় ভাই আনোয়ার। তিন বছর আগে ঢাকা যায় কাজের খোঁজে। তারপর থেকে আর খবর নেই। যাওয়ার আগে বলে যায় , ” টেকা ছাড়া ঢাকা শহরে কারো দাম নাই আব্বা। হাতে টেকা হইলে তোমাগো সবাইরে ঢাকা নিয়া যামু । তোমরা চিন্তা কইরো না মাস্টার সাবের মোবাইলে ফুন করমু। ভালো থাকিস রে ময়না ” । অনেক কেঁদেছিল ময়না ।

পরের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলো ময়না। ” কি রে ময়না , আইজকা এতো সকালে উইঠা গেলি।অন্যদিন ও মহারাণীর মত অনেক বেলা ঘুমাস”। ” কাইল রাইতে ভাইয়ের কথা মেলা মনে পড়ছিল মা। মনডা খারাপ লাগতাছে। আব্বায় কই গেছে ” । ” তোর আব্বায় একটু মাস্টারের বাড়িতে গেছে , মাস্টারের পোলায় খবর দিয়া নিলো” । ” কেমন আছো গো খালা । কেমন আছস রে ময়না “। ” আমেনা বুবু , কেমন আছো তুমি। মেলাদিন হয় তুমারে দেহি না। আসো না কেন আমাগো বাড়িতে “। ((বাপ মা মরা মেয়ে আমেনা। মামার কাছে থাকে।মামা অনেক আদর করলেও মামীর চোখের কাঁটা। মামীর কথা ,, ” বাড়িত থাকতে চাইলে কাম করতে হইব , বসায় বসায় খাওয়াইতে পারবো না বাপু “। অথচ এটা আমেনার বাপের বাড়ি। বাপ মা মরার পর মামারা থাকে।)) “ভালো আছি রে ময়না “। ” আমেনা “। ” কি খালা,। তুমার মন খারাপ নাকি । কি হইছে “। ” কিছু হয়নাই রে , পোলাডার কোন খবর পাইনা। তোরে বিয়া করবো দেইখা ঢাকা গেল টেকা কামাইতে , আর আইলো না। সেই ছোট থেইকা তগো প্রেম , বিয়ার কথাও হইল । তোরে ভালো রাখার জন্যই তো গেল “। ” মন খারাপ কইর না খালা। আমি তো এহনো আনোয়ার রে ভালোবাসি। ওরে ছাড়া অন্য কাউরে কেমনে বিয়া করমু । কি রান্না করতাছো খালা “। ” ঘরের চালে কুমড়া হইছিলো রে।। ওই টাই মাছ দিয়া রানতাছি “”। এমন সময় ময়না এসে বলল , ” মা , ও মা আব্বা আইছে , তুমারে ঘরে যাইতে কইল” । ” খালু কই গেছিলো “। ” মাস্টারের বাড়িতে গেছিলো। আয় ঘরে যাই “।

রহিম মিয়া আমেনা কে দেখে বলল , ” কেমন আছস রে মা , মেলা দিন পরে দেখলাম “। ” ভালো আছি খালু । মাস্টারের বাড়িতে কেন গেছিলা ? আনোয়ারের কি কোন খবর পাইলা “।

রহিম মিয়া : হ রে মা , পাইলাম । ফুন করছিল।

জমিলা : কি খবর আমার পোলার। কেমন আছে?

রহিম মিয়া : আনোয়ার ভালো আছে। গার্মেন্টসে চাকরি লইছে।

জমিলা : ময়নার আর আমেনার কথা জিগায় নাই ?

রহিম মিয়া : জিগাইছিলো। ময়নার লেইগা জামা কিনছে , খেলনা কিনছে।

জমিলা : আমেনার কথা জিগায় নাই ?

রহিম মিয়া : জিগাইছে , কিন্তু ‌,,,, বলেই আমেনার দিকে তাকালো রহিম মিয়া।

আমেনা : কি হইছে খালু , অমন কইরা চুপ কইরা গেলা কেন ?

জমিলা : কি হইছে , কিছু কওনা কেন ?

রহিম মিয়া : আমারে তুই মাফ কইরা দেইশ রে মা। আমি আনোয়ারের লগে তরে বিয়া দিতে চাইছিলাম। কিন্তু আনোয়ার বিয়া কইরা ফেলসে রে মা। তুই ভাবিস না মা , তোরে ভালো জায়গায় বিয়া দিমু আমি।

আমেনা : আমি এহন যাই খালু। অনেকক্ষণ আইছি। মামী বকবো।

বলেই চলে যায় আমেনা। বাইরে খেলছিল ময়না। ঘরে এসে তার মাকে বলল , ” আমেনা বুবুর কি হইছে গো মা কানতে কানতে চইলা গেল”। ” তোর ভাইয়ে বিয়া কইরা ফেলসে রে মা। আমেনা রে কি বুঝামু । তুই যা স্কুলে যাইতে হইবো” । বিকেলে মাঠে ছেলেমেয়েদের সাথে খেলছে ময়না। হঠাৎ দেখে আমেনা মাঠের কোণার আম গাছটার নিচে বইসা আছে। ” এই খানে বইসা আছো কেন আমেনা বুবু”.। ” এমনেই রে ময়না “। ” তুমি ভাইবো‌ না বুবু । তোমারে অনেক ভালো পোলার লগে বিয়া দিমু “। ” তুই অনেক ভালো রে ময়না । কাউরে ভালোবাসিস না রে ময়না । অনেক কষ্ট পাইতে হয় “। ময়না কিছুই বুঝতে পারে না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

” যাইরে ময়না , ভালো থাকিস “. । ” আমেনা বুবু চল না আইজ আমার লগে থাকবা” । ” না রে ময়না , মামী বকবো। বাপ মা মরার পরে তো কষ্ট ছাড়া কিছুই পাই নাই। আনোয়ারের ভালোবাসায় সব ভুইলা আছিলাম। এহন তো ওইটাও নাই। ভাবছিলাম তদের বাড়িতে সূখেই থাকমু। কপালে নাই রে। এই চুড়ি টা রাখ , তোর ভাইয়ে দিসিলো। কাউরে ভালোবাসিস না ময়না ” । আমি তুমারে কথা দিতাছি বূবু । আমি কোনদিন কাউরে ভালোবাসুম না “

রাতে ঘুমাতে পারে না আমেনা। অনেক প্রশ্ন মনের ভিতরে। সে ভাবে , ” আনোয়ার কেন এমনটা করল। কি দোষ করছিলাম আমি।কত স্বপ্ন দেখাইছিল । কইছিল ঢাকা গেলে অনেক টাকা কামানো যাইবো। পরে আমারে বিয়া কইরা লইয়া যাবো। সব কি মিথ্যা আছিলো ” । ভাবতে ভাবতে কান্না চলে আসে তার।

পরের দিন সকালে একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙ্গে ময়নার। ঘুম ভাঙ্গে মানুষ এর চেঁচামেচি তে। কি হয়েছে বুঝতে পারে না ময়না। বাইরে গিয়া বাবারে জিগাইলো ,” কি হইছে আব্বা , কান্দ ক্যান তুমি? এত মানুষ ক্যান ? ” মা রে , আমেনা কাইল মাঠের আম গাছের লগে গলায় ফাঁস দিছে । আনোয়ার এইডা তুই কি করলি রে ” , বলেই কান্নায় ভেংগে পরে রহিম মিয়া। দৌড়ে যায় ময়না। গিয়ে দেখে আমেনার লাশ নামানো হয়েছে। কাঁদতে পারে না ময়না। স্তব্ধ হয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে শুধু। আর ভাবে , ” এমন ক্যান করলা আমেনা বূবু। আমিও তো তোমারে কত্ত ভালোবাসতাম। তূমিও তো ভাইয়ের মতো ভালোবাসা বূঝলা না” ।‌‌ বিকেলে আমেনাদের বাড়িতে যায় ময়না। গিয়ে দেখে আমেনার মামা দোয়ারে বসে কাঁদছে। ” কাইন্দ না মামাবাবূ। আমি আছি তো তোমাগো দেখার লেইগা” । ময়নার কথা শুনে আমেনার মামী বলে , ” কাইন্দা এতো আদিখ্যেতার কি আছে বুঝি না বাপু। ভালোই হইছে , আপদ দূর হইছে। খরচপাতি তো কমলো। খালি খাইতো আর ঘুমিইতো।তোর ভাইয়েও ঠিক কাম করছে । এমন মাইয়ার লগে সংসার করা যায় না” । কিছু বলতে পারে না ময়না। ছোট যে , প্রতিবাদ করার মতো বয়স যে তার হয়নি। চলে যায় ময়না। রাতে মা বাবার সাথেই ঘুমায় ময়না। কিছুদিন হয় স্কুলে ও যায় না ময়না , পাড়ার ছেলেমেয়ের সাথে খেলতেও যায় না। সব বময় ভাবে , ” আমেনা বুবু ক্যান এমন করল , আমিও তো তারে কত্ত ভালোবাসতাম “।

” ময়না , ও ময়না “। ” কি কও আব্বা ?_”
” আইজ মঙ্গলবার , হাটের দিন। চল মা তোরে হাটে নিয়া যাই। অনেক দিন হয় তরে কোথাও লইয়া যাই না”।

” তুমি যাও আব্বা , আমি যামু না _” । ” চল রে মা , পুতুল কিইনা দিমু “।

হাটে যাওয়ার পথে ময়না তার আব্বারে জিগায় ,_ ” আমেনা বুবু ক্যান এমন করল আব্বা ? “

রহিম মিয়া উত্তর খুঁজে পায় না।
” ছোড মাইনষের এগুলা ভাবতে হয় না রে মা “।

হাট থেকে ফেরার পথে হুট করে পিছন থেকে ডাক আসে , ” ও রহিম মিয়া , দাঁড়াও দাঁড়াও “।
রহিম মিয়া : মাস্টার সাব আপনে ।
মাস্টার : তোমার বাড়ির দিকেই যাইতাছিলাম । ভালোই হইছে রাস্তায় দেখা হইছে।
রহিম মিয়া : কি হইছে মাস্টার সাব।
মাস্টার : তার আগে বল , ময়না স্কুলে যায় না ক্যান ?

রহিম মিয়া : আমেনার লেইগা খালি কান্দে । ঘর থেইকা বাইর হয় না।

মাস্টার : আচ্ছা , শুন রহিম মিয়া , আনোয়ার কাইল ফোন করছিল । দুই দিন পর তোমাগো নিতে আসবো ।

ময়না : ভাই রে আইতে না করেন মাস্টার চাচা। ওর লেইগা আমেনা বুবু আমারে ছাইড়া চইলা গেছে । ওরে আইতে না করেন ।

মাস্টার : এমন কথা বলতে নাই ময়না । শুন রহিম মিয়া অনেক দিন পর তোমার পোলা আইতাছে , রাগ কইর না।

রহিম মিয়া : আইচ্ছা মাস্টার সাব। এহন যাই।

দুই দিন পর আনোয়ার আসে গ্রামে।

জমিলা : আনোয়ার তুই আইছস বাজান। এতদিন পরে আইলি রে।

আনোয়ার : ঢাকায় কামের অনেক চাপ মা। মেলা কষ্টে দুই দিনের ছুটি নিয়া আইছি। তুমরা কেমন আছো মা , আব্বা আর ময়না কই ?

জমিলা : তোর আব্বা বাজারে গেছে , ময়না কই ঘুরতাছে কে জানে। তুই ঘরে যা।। আমি তোরে খাইতে দেই।

” অনেক দিন পর তুমার হাতের রান্না খাইতাছি মা। কত শান্তি লাগতাছে” ।সব শুনে আর পাখা দিয়ে বাতাস করে জমিলা।এমন সময় ময়না আসে।আনোয়ার : আরে ময়না কই ছিলি রে তুই। দেখ তোর লাইগা কি আনছি। খাড়া , খাইয়া নেই।মন খারাপ হয়ে যায় ময়নার।” তুই কেন আইছস ভাই । তর লাইগা আমেনা বুবু আমারে ছাইড়া চইলা গেছে। তুই যা।চইলা যা”।কিছু বুঝতে পারে না আনোয়ার । ” কি হইছে মা। আমেনার কি হইছে _”।” তোর বিয়ার কথা শুইনা আমেনা গলায় ফাঁস দিছে রে বাজান “, বলেই আঁচলে মুখ ঢাকে জমিলা।

” তুই যা চইলা যা ” , বলেই বাইরে চলে যায় ময়না।আনোয়ার কিছু বলে না , চুপচাপ খেয়ে , শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ।বিকেলে আনোয়ার ময়না রে ডাকে ,” চল রে ময়না আমেনার বাড়িতে যাই ” । ” তুই যা আমি যামু না “। ” চল রে বইন “। আনোয়ার এর সাথে আমেনার বাড়িতে যায় ময়না।

” কেমন আছেন মামা ? “” তুমি আইছ আনোয়ার , তোমার লাইগা মাইয়া আমার মইরা গেল। মেলা ভালোবাসতো তুমারে _”।

আমেনার মামী বলে ,” আইছে মহারাজ ঢাকা থেইকা বড়লোক হইয়া। বলি কত বড়লোক হইছ তুমি যে আমার আদরের মাইয়া আমেনা রে ভুইলা গেলা “, বলেই আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে আমেনার মামী।

সেদিন আর আজকের মামীর মধ্যে কোন মিল খুঁজে পায় না ময়না। সে ভাবে ,” আইজ মামীমা কাদতাছে , অথচ সেদিন আমেনা বুবু রে গাইলমন্দ করল। কি দরকার আইজকা এমন নাটক কইরা সবার কাছে ভালো সাজার ” । উত্তর খুঁজে পায় না ময়না। মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন।”আমারে মাফ কইরা দিয়েন মামা __”।

” মাফ কইরা দিলেই কি আর আমার মাইয়া ফিরা আইবো। তুমি ভাইবো না , অনেক আগেই তুমারে মাফ কইরা দিছি । সব ই কফালের দোষ । কি করা যাইবো “। ” আইজকা যাই মামা । ভালো থাইকেন “।

রাতে খাবার সময় , ” তোমাগো সবাই রে নিয়া যাইতে আইছি আব্বা । মালপত্র গুছায় লও “।
” ঠিক আছে বাজান , তুই যা ভালো মনে করস “।
দুই দিন পর ময়নারা ঢাকা যাওয়ার জন্য বের হয়। ” খাড়াও আব্বা । আমি আইতাছি ” । ” কই যাস রে ময়না। দেরি করিস না “।

আমেনার কবরের কাছে যায় ময়না । ” আমি ঢাকা যাইতাছি আমেনা বুবু। তুমি চিন্তা কইরো না , আমি কাউরে ভালোবাসমু না। আমি আবার আসমু তোমার কাছে । তুমি ভালো থাইকো আমেনা বুবু ” । চলে আসে ময়না।

বিকেলে ঢাকায় পৌঁছায় তারা। মিরপুর এক বস্তিতে থাকে আনোয়ার। __ ” রহিমা ও রহিমা দরজা খুলো। দেহ কাদের নিয়া আইছি ” । দরজা খুলে রহিমা । সালাম দিয়ে সবাইকে ভিতরে যাইতে বলে।

খাওয়ায় ব্যবস্থা করে রহিমা । সবাই ক্লান্ত থাকায় রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। দুইটা ঘর মাত্র।

রাতে রহিমা আনোয়ার কে বলে , ” অভাবের সংসার আমাগোর , আবার বাপ মা বইন রে নিয়া আইছ। এত খরচ চালামু কেমনে । গার্মেন্টসে কাম কইরি আর কত টেকা হয় “। আনোয়ার উত্তর দেয় না।

বেশ কিছুদিন ভালোই চলে তাদের। বস্তির কয়েকটা ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয় ময়নার। তাদের সাথেই সারাদিন খেলে ময়না। রহিমা শশুর শাশুড়ির ভালোই যত্ন করে কিন্তু ময়না কে মাঝে মাঝে বকে।

ময়না একদিন আনোয়ার কে বলে , ” রহিমা ভাবী একটুও ভালো না। আমারে খালি বকে । আমেনা বুবু থাকলে আমারে কোনদিন বকতো না , খাওয়ায় দিত “।

আনোয়ার ময়নার কপালে একটা চুমু দেয় কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারে না । বছর খানেক পর রহিমা গর্ভবতী হয় । ময়নাও‌ একটু বড় হয়েছে । বস্তির পাশের একটা স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। এখন আর আগের মতো শশুর শাশুড়ি কে যত্ন করে না রহিমা । প্রায়ই কথা শোনায়। একদিন তো আনোয়ার কে বলেই ফেলে , ” তোমার বাপেরে কও কাম কাজ করতে । আর কত বইসা বইসা খাবো। অভাবের সংসার। বাচ্চা হইলে আরো টানাপোড়েন লাগবো। হয় কাম করতে কও নাইলে অন্য কোথাও চইলা যাইতে কও , আর কয়দিন পর আমার বাপ মা আসবো গ্রাম থেইকা “। ” আচ্ছা আমি দেখি কি করা যায় ” । রাতে খাওয়ার পর আনোয়ার তার আব্বারে বলে , ” আব্বা তোমরা অন্য কোথাও চইলা যাও। কিছুদিন পর রহিমার বাপ মা আবো‌। তাগোরে থাকতে দিতে হবো । আর তো ঘর নাই আমার “। ” চিনি না জানি না কই যামুরে বাজান । কাম কাজ নাই , খামু কেমনে “।

” তুমি চিন্তা কইরো না , গাজীপুরে আলম চাচা থাকে , তার সাথে কথা বলছি। তুমারে কামের জোগাড় কইরা দিবে “। ঠিক আছে বাজান “। দুইদিন পর ময়নারা গাজীপুর চলে যায় । যাওয়ার আগে ময়না বলে যায় , ” তুমি আমাগোরে তাড়ায় দিলা ভাই। আর কোন দিন ফিরুম না তোমার কাছে ” । কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় ময়না।

বেশ কয়েক বছর পর ,,,,

ময়নার বয়স এখন প্রায় সতের কি আঠারো। দশম শ্রেণি পাশ করেছে । দেখতেও বেশ সুন্দরী ।ময়নার বাবা ছোট একটা দোকান দিছে বস্তির পাশে । ভালোই টাকা কামায়। একদিন ময়না রহিম মিয়া কে বলে , ” আব্বা চলো আমরা গ্রামে যাই।। এখন আর ঢাকা শহরে ভালো লাগে না ” । ” কিন্তু মা তোরে যে পড়ালেহা কইরা ডাক্তার হতে হইব , আমাগোর অভাব দূর করতে হইবো ” । ” আমি গ্রামের কলেজে ভর্তি হবো আব্বা । এখানে আর ভালো লাগে না আমার” । জমিলাও বলে , ” ময়না তো ঠিকই কইতাছে । টেকা তো কিছু হইছেই। চলো গ্রামে যাইগা”।

প্রায় এক মাস পর গ্রামে চলে যায় ময়নারা। এই কয়েক বছরে আনোয়ার তাদের কোন খোঁজ নেয় নি। গ্রামে মাস্টার এর বাড়িতে কিছু দিনের জন্য উঠে ময়নারা। তাদের বাড়ি ঠিক করতে কিছু দিন সময় লাগবে। কিছুদিন পর ময়নারা তাদের বাড়িতে ওঠে। গত কয়েক বছর আমেনার কথা মনে পরেনি ময়নার। একদিন বিকেলে সে আমেনার কবরে যায় , ” কেমন আছো তুমি আমেনা বুবু ? দেখছো তোমার কাছে ফিরা আসছি । আমি এখন অনেক শিক্ষিত । জানো ভাই আমাদের তাড়ায় দিছিল । আর খোঁজ নেয় নাই। এখন যাইগা আমেনা বুবু । তুমি ভালো থাইকো” । ময়না প্রায় ই আমেনার কবর পরিস্কার করে দিয়ে আসে। কবরের পাশে একটা গোলাপ গাছ লাগিয়েছে ময়না। কলি হয়েছে অনেক গুলো । কিন্তু ফুল হয়না।

এদিকে ময়না কে দেখে মাস্টার এর ছোট ছেলে মতিউর অনেক পছন্দ করলো। মতিউর ঢাকায় ব্যবসা করে। ভালোই টাকা কামায়। ময়নার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিলে রহিম মিয়া ও জমিলা রাজি হয়ে যায়। গরীবের মেয়ের জন্য এত ভালো জামাই পাওয়া কঠিন। বিয়ে ঠিক হয় ময়নার। বিয়ের আগের দিন বিকেলে ময়না আবার ও আমেনার কবরে যায়।

” জানো আমেনা বুবু আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু আমি কেমনে বিয়ে করবো আমেনা বুবু। বিয়ে করলে তো স্বামী কে ভালোবাসতে হবে । আমি তো তোমাকে কথা দিছিলাম যে কোনদিন কাউকে ভালোবাসবো না। আমি আজও কাউকে ভালোবাসি নাই বুবু। আমি কাউকে ভালোবেসে তোমার মতো কষ্ট সহ্য করতে পারবো না বুবু ” , বলতে বলতে কাঁদতে থাকে ময়না। অনেক রাত হয়ে গেছে বাড়ি ফিরেনি ময়না। অনেক খুঁজেও পাওয়া যায় না। সকালে আমেনার কবরের কাছে পরে থাকতে দেখা যায় ময়না কে। সবাই গিয়ে দেখে মরে গেছে ময়না। কবরের পাশের গোলাপ গাছটায় অনেক গোলাপ ফুটেছে। রক্তের মতো লাল টুকটুকে। গোলাপ গুলো যেন হাসছে। এ যেন ময়নার ই হাসি । ভালোবেসে কষ্ট না পাওয়ার হাসি।

শিক্ষার্থী লেখকঃ
সাবিকুন নাহার সিফা
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়