ভূমি আইনের খসড়া: সমস্যা ও সম্ভাবনা

আহসান উল্লাহ চৌধুরী:

আইন কমিশন প্রচলিত ভূমি আইনসমূহ পরিমার্জন সংশোধন ও সংযোজন করে ‘বাংলাদেশ ভূমি আইন-২০২০ (খসড়া) এর একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেছে এবং আইন সম্পর্কে মতামত চেয়েছে। বাংলাদেশের ভূমি সংক্রান্ত প্রত্যক্ষ পরোক্ষ যত আইন আছে তার তা সংশোধন ও সংহতিকরণকল্পে এই আইন প্রণীত হবে।

খসড়া আইনটি সংসদে দুই তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হলে দেশের ভূমি আইনের আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে এবং একটি মাইলফলক হিসেবে থাকবে। প্রস্তাবিত আইনে ভূমি সম্পর্কিত সকল বিভাগকে একটি আইন এর আওতায় নিয়ে আসা হবে।

প্রস্তাবিত আইনটি প্রয়োগে আসলে এর ভালো ও খারাপ দুটো দিকই সামনে আসবে।।

এই আইনের সম্ভাবনা-
১. ভূমি সংক্রান্ত সকল সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

২. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে।

৩. সময় ও ভোগান্তি দুটোই লাঘব হবে।

৪. দ্রুত বিচার পাওয়া যাবে।

৫. ভূমির সঠিক ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে।

৬. ভূমি সম্পর্কিত জটিলতা কমবে।

৭. জনগণের খরচ কমবে।

৮. আফিস থেকে অফিস ফাইল নিয়ে ঘুরতে হবে না।

৯. সরকার এর রাজস্ব আয় বাড়বে।

১০. ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন হবে।

১১. পুরোনো সকল ভূমি স্পর্কিত আইন যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গিয়েছে তা থেকে উত্তরণ ঘটবে।

১২. যারা ভূমি সংক্রান্ত ডকুমেন্ট তৈরি করবে। তারাই সংশোধন করবে বলে দ্রুত ও সঠিকভাবে মাঠপর্যায়ের গিয়ে সমস্যা সমাধান করা যাবে।

১৩. মাঠপর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হবে।

১৪. ভূমি সংক্রান্ত সকল সেবা জনগণের হাতের কাছে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো সম্ভব হবে,
১৫. সরকারি সম্পত্তি/(খাস জমি, হাট বাজার, সায়রাতমহল) ইত্যাদি বন্দোবস্ত, বেদখল উচ্ছেদ, সহ যাবতীয় কার্যক্রম সহজ হবে।

এই আইনে সমস্যা-
১. খসড়া আইনটিতে ভূমি সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তিতে দেওয়ানী আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট এর ক্ষমতা খর্ব করার বা সীমিত করার নজিরবিহীন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা সরাসরি CPC ধারা ৯ ও সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এর সাথে সাংঘর্ষিক।

২. ভূমি আইন সংক্রান্ত ১০০ আইনের মধ্যে প্রধান ২১টি আইন বিলুপ্ত করা হবে। নতুন আইন প্রণয়ণ হলে ২১ আইনের কার্যকরীতা থাকবে না। তবে যেসব মামলা পূর্বের আইনে দায়ের করা হয়েছে তা পূর্বের আইনের নিষ্পত্তি করা হবে।

৩. অবৈধ দখল উচ্ছেদে দেওয়ানী আদালত এর কোন ক্ষমতা থাকবে না। তাই specific relief act এর ৯ ধারা অকার্যকর হয়ে যাবে।

৪. প্রত্যেক জেলায়, ভুল রেকর্ড, সীমানা বিরোধ, বন্টন, অবৈধ দখল, জবর দখল সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এডিসি, এসি ল্যান্ড, ও সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার এর সমন্বয়ে একটি কমিটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে। [ধারা-২৬৪] এই কমিটি ট্রাইব্যুনালের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে।
ফলে দেওয়ানী আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট কোন মামলা গ্রহণ বা শুনানি করতে পারবে না।

৫. এই কমিটি/ট্রাইব্যুনালে বিচারক আইনজীবি কেউ থাকবে না। ট্রাইব্যুনাল বা কমিটির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনবেন বিভাগীয় কমিশনার। যার সিদ্ধান্ত “চুড়ান্ত বলে গণ্য হবে। [ধারা-২৬৬] কেবল বাটোয়ারা ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ শুনতে পারবে দেওয়ানী আদালত।

৬. ভূমিদস্যু, রিয়েল স্টেট কম্পানি ও ক্ষমতাবান নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাহী বিভাগ কতটুকু কার্যকর স্বাধীনভাবে তার কাজ পরিচালনা করতে পারবে সেটাই প্রশ্ন! কতটুকু সুবিচার পাওয়া যাবে।

৭. প্রচলিত আইনের মোবাইল কোর্ট এর মাধ্যমে সীমিত পরিসরে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সেখানে তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা কী জনসাধারণ কে সুবিচার এনে দিতে পারবে?

৮. রেকর্ড সংশোধনে ভুলের কারণে দেওয়ানী আদালতের ঘাড়ে একসাথে ৫/৭ লাখ মামলা এসে পড়েছে। ভূমি অফিসের অনিয়মের কারনে অধিকাংশ দেওয়ানী মামলার জন্ম হলেও সেই প্রশাসনের হাতেই ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তিতে আস্থা রাখা আদৌ কী সম্ভব?

লেখক: শিক্ষার্থী, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া